Adsterra

লোড হচ্ছে...

বদলে যাওয়া ঘোষপল্লি


বদলে যাওয়া ঘোষপল্লি,ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News

সাতক্ষীরার তালার ছোট্ট জনপদ ঘোষপল্লি। প্রত্যন্ত এই গ্রামে দুই শতাধিক পরিবারের বসতি। টিন আর মাটির দোচালার প্রায় সব বাড়িতে আছে গোয়ালঘর। ছোট জায়গায় গোয়ালঘর আর বাড়ি আলাদা করা যায় না। আঙিনাতেই ধানের খড়ের গাদা। গরুর খাবার, গোসল করানো ও দুধ সংগ্রহ– এসব কাজে পরিবারের নারী সদস্যের ব্যস্ততা বেশি। আয় বলতে দুধ বিক্রির টাকা, যা দিলে চলে সংসার খরচ। কোনো বিপদে আপদে টাকার দরকার হলে ঋণের বোঝা মাথায় চাপে। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ ছিল গবাদি পশুর গোবরের যন্ত্রণা। দুর্গন্ধ আর বর্জ্য গ্রামের মানুষকে বিষিয়ে তুলেছিল। এমনকি গ্রামের কারও বিয়ের আয়োজনেও দেখা দিত বিপত্তি।

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা তালা উপজেলার জিয়ালা গ্রামের ঘোষপল্লির এমন চিত্র ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তবে গেল ৯ বছরে বদলে গেছে ঘোষপল্লি। বিরক্তির সেই গবাদি পশুর গোবর এখন গ্রামের মানুষের সুখের সোপান। দালানকোঠা, জীবন-জীবিকার পালাবদলে ভাসছে ঘোষপল্লি। 

গোবর-বর্জ্যের বিড়ম্বনা

মূলত বাপ-দাদার সনাতন পদ্ধতিতে পশু পালনে অভ্যস্ত ছিল গ্রামবাসী। ২০১৭ সালের দিকে ঘোষপল্লিতে গরু ছিল ৫০০ থেকে ৬০০। আয়ের প্রধান উৎস গোয়ালের দুধ। এই দুধ উৎপাদন করতে গিয়ে গোবর নিয়ে বিপদে পড়েন পল্লির মানুষ। দেশি গরু খাবার খেত অল্প; দুধ উৎপাদনও ছিল কম। একটা সময় বিদেশি উন্নত জাতের গরু পালন শুরু হয়। এসব জাতের গরুর খাবার লাগে ভরপুর; দুধও আসে বেশি। গোবর উৎপাদনও বাড়ে কয়েক গুণ। বাড়তে থাকে বিপত্তি। আগে প্রতি গরু থেকে গড়ে পাঁচ থেকে ছয় কেজি গোবর আসত। সেই গোবর পরিবারগুলো জ্বালানি ও সারের কাজে ব্যবহার করত। 

বিদেশি গরু আসার পর সেই গোবর ১৫ থেকে ২০ কেজিতে গিয়ে ঠেকে। এ ছাড়া গোমূত্র ও গাভির গোসলের পানি একাকার হয়ে পুরো গ্রাম দুর্গন্ধ আর স্যাঁতসেঁতে থাকত। বর্জ্য ভরাট হয়ে গ্রামের পাশে বয়ে যাওয়া খালে পড়ত; এরপর কপোতাক্ষ নদে। দূষণ, রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও বাড়ছিল। 

গোয়ালঘর থেকে জৈব সারের খামার

গোবর আর বর্জ্যের যন্ত্রণায় যখন ত্রাহি দশা, তখন এগিয়ে আসে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উন্নয়ন প্রচেষ্টা’। সংগঠক শেখ এয়াকুব আলী গ্রামের এই দূষণ রোধে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সঙ্গে সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। পিকেএসএফের কর্মকর্তারা গ্রামটি ঘুরে দেখেন। 

২০১৮ সালে শুরু হয় গোবর ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ। গোবর জমা রাখার জন্য ঘোষপল্লি ঘিরে গড়ে তোলা হয় বড় শেড। সেখান থেকে জৈব সার তৈরি করার উদ্যোক্তা গোবর সংগ্রহ করতে শুরু করেন। বড় শেডের পাশাপাশি খামারিদের গোয়ালঘরেও শেড জমা রাখা গোবরও সংগ্রহ করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে জৈর সার তৈরি কাঁচামালের গুদামঘর হয়ে ওঠে ঘোষপল্লি। এদিকে জমা করা গোবরের জন্য তৈরি করা হয় নতুন ক্রেতা। পিকেএসএফ ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে ভার্মিকম্পোস্ট, ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদনের জন্য উদ্যোক্তা তৈরি করে। সেসব উদ্যোক্তাকে এসব খামার থেকে গোবর সংগ্রহের জন্য সংযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। এতে খামারিরা গোবর বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছেন। যা আগে ফেলে দেওয়া হতো, সেই গোবর এখন প্রতি বস্তা ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এভাবে দুধের পাশাপাশি দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকার গোবর বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন খামারিরা। এই দুগ্ধপল্লির গ্রামটি এখন হয়ে উঠেছে ‘সার্কুলার ইকোনমি’র বড় বিজ্ঞাপন।

স্মার্ট প্রকল্পের সুপারভাইজার নাহিদ হাসান জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে গোয়ালের পাশাপাশি গোমূত্র ও গোসলের পানির জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা গ্রামের সব খামারের সঙ্গে যুক্ত। এই তরল বর্জ্য তিন স্তরে প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধন করা হয়। সর্বশেষ জিকজ্যাক ড্রেনেজ সিস্টেমে পরিশোধিত পানি খালে নিঃসরণ হয়। এতে খালের পানির দূষণ কমে আসে।

বদলে যাওয়া পল্লিতে একদিন

জিয়ালা গ্রামের ঘোষপল্লিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক বাড়ির উঠানে দুই গৃহবধূর আড্ডা। তাদের একজন চায়না ঘোষ। তিনি বাড়ির বড় বউ। তিনি জানান, একসময় তাদের বাড়িতে গোবর পড়ে থাকত। এ ছাড়া গোমূত্র আর আবর্জনায় চারদিক ছিল দুর্গন্ধময়। কয়েক বছর আগে উন্নয়ন প্রচেষ্টার সহায়তায় তাদের ভাগ্য বদলেছে। পল্লিতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এখন দুধের পাশাপাশি গোবর বিক্রি করে তারা স্বাবলম্বী।

গৃহবধূ অর্চনা ঘোষ জানান, ২০০৮ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের সব বোঝা পড়ে তাঁর ঘাড়ে। স্বামী হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা প্রায়। বেসরকারি এক সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে একটি গরু কেনেন। এখন তিনি সাতটি গাভির মালিক। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করায় গরু পালন এখন তাঁর কাছে আরও সহজ।

একই এলাকার গোপাল শীল জানান, স্কুলের চাকরির পাশাপাশি তিনি বাড়িতে গাভি পালন করেন। কয়েক বছর আগে একটি বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে বায়োগ্যাস প্লান্ট নিয়ে গোবর ব্যবহার করে বাড়ির রান্না করতে পারছেন। একই সঙ্গে প্লান্টে ব্যবহারিত গোবর থেকে সংস্থার পরামর্শে কেঁচো ব্যবহারের কম্পোস্ট সার তৈরি করে তা বাজারে বিক্রি করছেন।

যা বলছেন খামারিরা

খামারি লিটু ঘোষ জানান, একসময় দুধ বিক্রি একমাত্র আয়ের উৎস ছিল। উন্নয়ন প্রচেষ্টার সহযোগিতায় দুধের পাশাপাশি এখন গোবর বিক্রি করে অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন। 

খামারি সুনীল ঘোষ জানান, তিনি ২০ বছর ধরে গরু পালন করে আসছেন। উন্নয়ন প্রচেষ্টার সহযোগিতায় এখন তিনি গরুর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে টিকাদান পরামর্শ, গোমূত্রের ব্যবহার করে বায়োগ্যাস তৈরিসহ নানা রকম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রকল্প ব্যবস্থাপক খায়রুজ্জামান বলেন, উন্নয়ন প্রচেষ্টা জিয়ালা দুগ্ধপল্লিতে পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ ট্রান্সফরমেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জিয়ালা ছাড়াও খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার কয়েকটি উপজেলায় এক হাজার দুগ্ধ উৎপাদনকারী ও প্রক্রিয়াজাতকারী নিয়ে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে।

প্রকল্পের মাধ্যমে গাভি পালনকারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন করার পাশাপাশি সম্পদ সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে গাভি পালনের ওপর খামারিদের বিভিন্ন প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাসের ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভার্মিকম্পোস্ট, ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন, বায়োগ্যাস উৎপাদন, গোমূত্র ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ রোধ, উন্নত বাজার সংযোগ, স্বাস্থ্যকর উৎপাদন এ প্রকল্পের মূল বিষয়। 

বদলে গেছে পাশের গ্রামও 

জিয়ালার ঘোষপাড়ার গোবরের শেড থেকে প্রতিদিন শত শত টন গোবর সংগ্রহ করেন আশপাশের গ্রামের জৈব সার উৎপাদনকারীরা। ২০১৩-১৪ সাল থেকে এসব জৈব সার উৎপাদনকারী ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন করতেন। এরপর শুরু হয় ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ট্রাইকো লিচেট উৎপাদন।

এ রকম একজন উদ্যোক্তা শিবপুর গ্রামের মোড়ল আবদুল মালেক। তাঁর বাড়ির সামনে দেখা যায়, দুপাশে দুটি শেডে ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন হচ্ছে। একটিতে তিন নারী কেঁচো থেকে সার আলাদা করছেন। বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িই যেন একটি জৈব সারের কারখানা। কোথাও মাটির মধ্যে গর্ত করে চৌবাচ্চার মতো কাঠ ও প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে, কোথাও একটার ওপর আরেকটা রিং দিয়ে, কোথাও বিশাল স্তূপের গোবর ঢেকে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও সারি সারি বস্তায় বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে জৈব সার।

প্রতি কেজি সার পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। এসব সার বিক্রি হয়ে যায় বাড়ির উঠানেই। পাইকাররা বাড়ি থেকেই সংগ্রহ করেন। কোনো কোনো কোম্পানি এখানেই নিজেদের ব্র্যান্ডের বস্তায় ভরে নিয়ে যায়, পরে বাজারজাত করে। ট্রাইকো কম্পোস্ট থেকে যে নির্যাস বের হয়, সেটি আবার প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মোড়ল আবদুল মালেক বলেন, আমি একসময় মৌমাছি চাষ করতাম। কৃষকরা ক্ষেতে বালাইনাশক ব্যবহার করায় মৌমাছি কমে গেছে। তাই প্রাকৃতিক এই ট্রাইকো লিচেট উৎপাদন করছি। এতে উপকারী কোনো প্রাণের ক্ষতি হবে না। আমাদের বাস্তুসংস্থান ঠিক থাকবে।

অমিত ঘোষ নামে আরেকজন জানান, ঘোষপল্লি ঘিরে এখন শতাধিক মানুষ জৈব সারের ব্যবসা শুরু করেছেন। এখানে দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে ২০০ শ্রমিক কাজ করছেন। 

বিকল্প কর্মসংস্থান

দুধওয়ালা গাভির সংখ্যা বাড়ার ফলে খাদ্যের চাহিদা বেড়েছে। তাই অনেকেই জমিতে উন্নত জাতের ঘাস চাষ করছেন। কৃষক সালমান তিন বিঘা জমিতে চাষ করেছেন নেপিয়ার ঘাস। তিনি জানান, ঘাস অন্য ফসলের চেয়ে লাভজনক। তাই সাতক্ষীরার এই অঞ্চলের কৃষকরা গো-খাদ্য হিসেবে ঘাস উৎপাদন করছেন। আবার ঘাস ও অন্য ফসলের ক্ষেতে ব্যবহার করছেন গোবর থেকে উৎপাদিত জৈব সার। 

জৈব সার উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি পশুর খাদ্য, ভেটেরিনারি দ্রব্যের ব্যবসার প্রসারও হয়েছে এই দুগ্ধ উৎপাদন ঘিরে। দুগ্ধ উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বড় বড় কোম্পানি এখান থেকে দুধ সংগ্রহ করছে। এ এলাকার উৎপাদিত দুধে তৈরি হবে দই, চিজ, বাটারসহ দুগ্ধজাত নানা পণ্য। 

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, যেখানে যে পণ্য উৎপাদনে তুলনামূলক সুবিধা আছে, সেখানে ক্লাস্টার গড়ে উঠছে। কারণ, সেই পণ্য ওই জায়গায় কম খরচে তৈরি করা যায়। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ভালো আয় পাওয়া যায়। এসব জায়গায় আমরা অর্থায়ন করলাম। দক্ষতা বাড়াতে কাজ করেছি, নতুন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছি, যাতে তারা আরও প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করতে পারে। 

তালা উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাসুম বিল্লাহ জানান, বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। উন্নয়ন প্রচেষ্টা তালাতে ক্লাইমেট স্মার্ট প্রকল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। খামারিদের প্রশিক্ষিত করে গবাদি পশু রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে সংস্থাটি।

আরো পড়ুন -  শুরু হচ্ছে বিপিএল, যেভাবে সূচি সমন্বয় হলো 

ঢাকাভয়েস/এই

No comments

Powered by Blogger.