হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আধিপত্যে চাপে ট্রাম্প ও তেলক্রেতা দেশ
হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরান নিজের ভৌগোলিক সুবিধার সর্বোচ্চটা ব্যবহার করছে। ক্রেতা দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপদের পরিবহনের জন্য ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে বাধ্য করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মিত্রদেশগুলোর কাছে সামরিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আহ্বান জানালেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো দেশ তার ডাকে সাড়া দেয়নি। ফলে অন্তত কয়েক সপ্তাহ হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতেই থাকবে। এই অবস্থায় জ্বালানি ক্রেতা দেশ ও ট্রাম্প চাপের মুখে রয়েছেন। ব্লুমবার্গ জানায়, যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি সব পক্ষের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় জ্বালানি বাণিজ্যে অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ইরান। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর সমাধান পেতে ট্রাম্পের সব সামরিক তৎপরতা এখন হরমুজের দিকে। গত সপ্তাহে পারস্য উপসাগরে একই দিনে তিনটি জাহাজে হামলা হয়। এ ঘটনার পর জাহাজ মালিকরা আরও ভয়ের মধ্যে পড়ে গেছেন। এর আগে একটি থাই-পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ারে হামলা হয়েছিল। এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল এনার্জির শিপিং ও মেটাল বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান রাহুল কাপুর মনে করেন, ‘হরমুজ এখন বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শিপিং ও জ্বালানি বাজারে এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাতের ঝুঁকি নিঃসন্দেহে কয়েক দশকের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।‘হরমুজ প্রণালি নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তাতে এশিয়ার বৃহৎ গ্রাহক দেশগুলো জ্বালানির ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান খরচ কমানোর জন্য বিকল্প সমাধান খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। ভারত তেহরানের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছে, এর ফলে সপ্তাহান্তে দুটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস ট্যাঙ্কার প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে। ভারতে রান্নার গ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত জ্বালানির তীব্র ঘাটতি দূর করার ক্ষেত্রে এটি একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
চীন নিজেরা পাহারা দিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ পার করে নিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রও তাই করতে চাইছে। এজন্য মিত্র দেশগুলোকে হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু দেশগুলো হামলার আশঙ্কায় ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এসব দেশের কারও কারও পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ রয়েছে। অনেকগুলো শক্তিশালী মিত্র দেশ হরমুজে হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ করেছে।
ট্রাম্পের আহ্বানে অনীহা মিত্র দেশগুলোর
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক জোট ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরতার কারণে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তাষ্ট্রকে সমর্থন করার জন্য আরও চাপে আছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচি বলেছেন, জাপানি জাহাজগুলোকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, টোকিও তা বিবেচনা করছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেন, আমরা নৌবাহিনী পাঠানোর কথা বিবেচনা করছি না। শান্তিবাদী সংবিধানের কারণে টোকিওর সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।দক্ষিণ কোরিয়া ট্রাম্পের অনুরোধ পর্যালোচনা করছে এবং এই বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করবে। দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান উভয়ই বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ আসেনি। এমনকি যদি কোনো কূটনৈতিক বা সামরিক সমাধান পাওয়া যায়, তবুও প্রণালীতে যান চলাচল পুনরুদ্ধার করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।
ট্রাম্পের অভিযোগের জবাব দিল চীন
সোমবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান প্রণালী নিরাপদ করতে বেইজিং জাহাজ পাঠাবে কিনা এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন। পরিবর্তে তিনি সব পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি এড়ানো যায় সেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করারও যুক্তি দিয়েছে দেশটি। সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশল কেন্দ্রের সিনিয়র ফেলো ঝো বো ব্লুমবার্গকে বলেন, হরমুজে যৌথ নৌ অভিযানে বেইজিংয়ের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা ‘শূন্য’।
যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
গার্ডিয়ান জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাত ধরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়ে তারা দেশটির হাজার হাজার সামরিক-বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু দিন যতোই যাচ্ছে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাপের মুখে রয়েছেন। এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হাতে আর থাকবে না। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের একজন সিনিয়র অফিসার মোহসেন রেজাই গত রোববার বলেন, ‘যুদ্ধের সমাপ্তি আমাদের হাতে। উপসাগর থেকে ওয়াশিংটনের বাহিনী প্রত্যাহার ও সব হামলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।‘ অথচ তিন সপ্তাহ আগেও তেহরানের সিনিয়র কর্মকর্তারা এত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে আটকে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
ট্রাম্প সংঘাতের সময়কালের জন্য একাধিক সময়সীমা দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার পরেই যুদ্ধ শেষ হবে। অনেক বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যুদ্ধ শুরু করে। নতুন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ঘোষিত সময়ের মধ্যে যুদ্ধ শেষ না হওয়ার শঙ্কাই বেশি। কারণ ইরানের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালি মুক্ত করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। হরমুজে মিত্রদের প্রতি তিনি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে কোনো দেশ সাড়া দেয়নি। অথচ ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হলো হরমুজ মুক্ত করা। প্রণালিটি বন্ধ হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা লেগেছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। এখন দ্রুত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প।
আরও পড়ুন ইরান যুদ্ধ কি পেট্রোডলার ব্যবস্থায় ভাঙন ধরাবে
ঢাকাভয়েস/এই

No comments