ইরান যুদ্ধ কি পেট্রোডলার ব্যবস্থায় ভাঙন ধরাবে
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম ধাক্কা দেখা গেছে তেলের বাজারে। বড় ও গভীর ধাক্কাটি সম্ভবত আরো পরে আসবে। এই আসাটা নির্ভর করবে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তির ওপর।গত পাঁচ দশকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারকে কেন্দ্র করে। ১৯৭০-এর দশকের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পেট্রোডলার ব্যবস্থা চালু হলে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক প্রভাবের কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়। তবে ইরান ঘিরে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ডলার ব্যবস্থা এখনই ভেঙে পড়বে বিষয়টা এমন নয়। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা; আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে শুরু হওয়া পরিবর্তনের গতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে।পেট্রোডলার ব্যবস্থার শুরু হয়েছিল ব্রেটন উডস পদ্ধতির বিপর্যয়ের পর। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে স্বর্ণে রূপান্তরের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর ১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা করে। এই সমঝোতা অনুযায়ী, সৌদি আরব ডলারের মাধ্যমে তাদের তেল রপ্তানির মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করে। আয়কৃত অর্থের অতিরিক্ত অংশ তারা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারে; বিশেষ করে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে। পরে অন্য তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করে।এই ব্যবস্থাটি একটি শক্তিশালী আর্থিক চক্র তৈরি করে। পৃথিবীর সবচেয়ে অপরিহার্য পণ্য হিসেবে তেল কাঠামোগতভাবে ডলারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোকে ডলার রিজার্ভ করতে শুরু করে। এভাবেই বিশ্বজুড়ে ডলারের স্থায়ী চাহিদা তৈরি হয়। অন্যদিকে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিপুল পরিমাণে ডলার বিনিয়োগ করায়, সেগুলো ঘুরেফিরে দেশটির ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে যায়।
তিন স্তম্ভ, এক হুমকি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৫৮ শতাংশ ডলারের দখলে। আর বিশ্বজুড়ে তেল লেনদেনের একটি বড় অংশ মার্কিন মুদ্রাতে সম্পন্ন হয়। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ব্যারি আইচেনগ্রিনের মতে, ডলারের এই আধিপত্য কেবল আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নয়, বরং দেশটির আর্থিক বাজারের গভীর তারল্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও নির্ভর করে।তবে মুদ্রাব্যবস্থা খুব কম সময়ই শুধু অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ রবার্ট গিলপিনের যুক্তি হলো- আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার অন্তর্নিহিত কাঠামোর প্রতিফলন ঘটায়। মুদ্রার আধিপত্য সাধারণত ভূরাজনৈতিক নেতৃত্বের পথ অনুসরণ করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে ব্রিটিশ পাউন্ড ছিল বিশ্ব অর্থনীতির মূল ভিত্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলো, তখন ডলার সেই স্থান দখল করে নেয়।
তাই পেট্রোডলার ব্যবস্থা মূলত তিনটি আন্তঃসংযুক্ত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, পারস্য উপসাগরে স্থিতিশীল জ্বালানি উৎপাদন; দ্বিতীয়ত, ডলারভিত্তিক তেল বাণিজ্যের প্রাধান্য এবং তৃতীয়ত, সমগ্র অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো বজায় রাখা।ইরানকে জড়িয়ে একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ এখন এই তিনটি স্তম্ভকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
অর্থ ব্যবস্থা যখন বিকল্প খোঁজে
বিশ্ব অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য এখনো অন্যতম কৌশলগত সংবেদনশীল অঞ্চল। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালির চেয়ে বড় উদাহরণ আর নেই। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) মতে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পেট্রোলিয়াম (দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল) এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। পাশাপাশি বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বড় অংশও এই পথে পাঠানো হয়।ইতিহাসে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালিতে সামান্য উত্তেজনাও তেলের দামে নাটকীয় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। একটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত কেবল জাহাজ চলাচলের পথই ব্যাহত করবে না, বরং বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার একটি স্থিতিশীল ভিত্তি হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর থাকা আস্থাকে ধসিয়ে দিতে পারে।আর এই ‘আস্থা’ হলো বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার একটি অদৃশ্য অবকাঠামো। বিনিয়োগকারী ও বহুজাতিক করপোরেশনগুলো ভবিষ্যতের পূর্বাভাসযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে তাদের কার্যক্রম চালায়। সেই পূর্বাভাসের ভিত্তি একবার দুর্বল হতে শুরু করলে, স্থিতিশীলতার জন্য পুঁজি ধীরে ধীরে বিকল্প পথের সন্ধান করে।এ ধরনের পরিবর্তন কীভাবে ঘটে সে উদাহরণও ইতিহাসে আছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ডাচ বাণিজ্যিক উত্থানের সময় বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা ঘুরতো আমস্টারডামকে কেন্দ্র করে। ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী যুগে তা লন্ডনে স্থানান্তরিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সে জায়গা নেয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক।
ক্রেতা যেদিকে, মুদ্রা সেদিকে
প্রতিটি রূপান্তরই ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার বৃহত্তর পুনর্বণ্টনের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ইতোমধ্যে আরেকটি কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। সেটি হলো বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার প্রাচ্যমুখী (এশিয়া) স্থানান্তর।বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো বিশ্বব্যাপী তেল ব্যবহারের শীর্ষে ছিল। বর্তমানে সেই গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু চূড়ান্তভাবে এশিয়ার দিকে সরে গেছে। চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। তারা দৈনিক ১১ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল কেনে। ভারত অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলোও তাদের জ্বালানি চাহিদা ক্রমাগত বাড়াচ্ছে।এই জ্বালানির বড় একটি অংশ এখনো পারস্য উপসাগর থেকে উৎপাদিত হয়। এই তেলের বৃহত্তম ক্রেতা যদি আটলান্টিক অঞ্চলের পরিবর্তে এশিয়ায় অবস্থান করে; তাহলে স্বাভাবিকভাবেই লেনদেনের মুদ্রার ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটবে। এই পরিবর্তনের প্রাথমিক লক্ষণগুলো এরইমধ্যে দৃশ্যমান।চীন তার মুদ্রা রেনমিনবির (চাইনিজ ইউয়ানের সরকারি নাম) আন্তর্জাতিকীকরণের প্রসার ঘটিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৮ সালে সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এক্সচেঞ্জে ইউয়ানভিত্তিক অপরিশোধিত তেলের ফিউচার ট্রেডিং শুরু করা। বেশ কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশও স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ব্যবস্থার উপায় খুঁজছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় উৎপাদকরাও মাঝেমধ্যে ডলারের বিকল্প মুদ্রায় জ্বালানি লেনদেনের ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে।ডলারের প্রভাবের বিপরীতে এই অগ্রগতি খুব বেশি বড় নয়। তবে অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাডাম টুজের মতে, এটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি ‘ধীর পুনর্গঠন’।
মুদ্রাকেন্দ্রিক বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থা
আধুনিক কৌশলগত প্রতিযোগিতায় এখন সামরিক শক্তির পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং বিধিনিষেধ এবং বৈশ্বিক পেমেন্ট সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াটা বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার শক্তিশালী কৌশলে পরিণত হয়েছে।ইরান বারবার এই চাপের সম্মুখীন হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তেহরানের তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং খাত এবং সুইফট পেমেন্ট নেটওয়ার্কের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।তবে আর্থিক জবরদস্তির ফলে অনাকাঙিক্ষত ঘটনাও ঘটে। এ ধরনের চাপের শিকার দেশগুলো এক সময় বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা কমানোর পথ খোঁজে। যেমন- ইরান ইতোমধ্যে পণ্য বিনিময় প্রথা, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং চীন ও রাশিয়ার মতো অংশীদারদের সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থা সংগত করার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। আরও বৃহত্তর পরিসরে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামো এবং আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল মুদ্রার উদ্যোগগুলো খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে। আর্থিক কৌশলবিদ জোল্টান পোজসারের মতে, এই ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে খণ্ডিত বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। ডলারের আসন্ন পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করার এখনো উপযুক্ত সময় হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, একটিমাত্র প্রভাবশালী রিজার্ভ মুদ্রার পরিবর্তে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে একটি বহুমুখী মুদ্রাব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে পারে। যেখানে ডলার কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকলেও আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থায়নে অন্যান্য মুদ্রার সঙ্গে প্রভাব ভাগাভাগি করে নেবে।একই সঙ্গে আরও বৈচিত্র্যময় আর্থিক ব্যবস্থা এশিয়া, আফ্রিকা বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠাই মূল চ্যালেঞ্জ নয়, বরং পরিবর্তনশীল ব্যবস্থায় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান তৈরি করাটাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন ট্রাম্প-শির আলোচিত বৈঠক ইরান যুদ্ধের জেরে পেছাচ্ছে
ঢাকাভয়েস/এই

No comments