ঈদে নতুন শাড়ি
এবারের ঈদে শাড়ির ট্রেন্ডে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার দারুণ এক সমন্বয় তৈরি করেছেন ডিজাইনাররা। শাড়িতে করা বিভিন্ন ফ্লোরাল ডিজাইন, আলপনা, মোটিভ, ব্লক প্রিন্ট ক্রেতার কাছে বেশ সমাদৃত হচ্ছে।
ঈদ মানে নতুন পোশাক, নতুন লুক আর নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ। ঈদে সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি কেনা তো হয়-ই; নতুন একটা শাড়ি না হলে ঠিক যেন জমে না। ঈদের দিন যে কোনো একটি বেলা বা পরের দিন অনেকেই পছন্দের পোশাক হিসেবে শাড়িকে শীর্ষে রাখেন। ঈদের সকালের স্নিগ্ধ সাজ কিংবা রাতের পার্টির ঔজ্জ্বল্য–সবখানেই শাড়ির আবেদন একইরকম। রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমল, ফ্যাশন হাউসগুলোয় ঈদের শাড়ির বাহারি সব কালেকশন পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ঈদ তুলনামূলক কিছুটা কম গরমে পড়েছে। আবহাওয়া ও আরামের কথা চিন্তা করে বেশির ভাগ ফ্যাশন হাউসের কাছে তাই আলাদাভাবে গুরুত্ব পেয়েছে সুতি তাঁতের শাড়ি। ঈদের সারাদিন ও দিনের বেলায় গরমের কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছে এসব শাড়ির নকশা। ঈদ যেহেতু উৎসব তাই সুতির পাশাপাশি সিল্ক, হাফসিল্ক, জামদানি, মসলিন শাড়িও প্রাধান্য পেয়েছে ঈদ বাজারে। তাঁত ও মসলিন শাড়িগুলোয় স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক, কাঁথার ফোঁড়, হাতের কাজ ও এমব্রয়ডারির কাজ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁতিদের নিজস্ব ডিজাইনের জামদানি, টাঙ্গাইল ও কাতান শাড়িও আছে ঈদে। শাড়ির রঙেও রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্য।এবারের ঈদে শাড়ির ট্রেন্ডে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক সমন্বয় তৈরি করেছেন ডিজাইনাররা। আলাদাভাবে নজর কেড়েছে প্রিন্টবেজড বা মিক্সড মিডিয়া ওয়ার্কের শাড়ি। শাড়িতে করা বিভিন্ন ফ্লোরাল ডিজাইন, আলপনা, মোটিভ, ব্লক প্রিন্ট ক্রেতার কাছে বেশ সমাদৃত হচ্ছে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার শাড়িতে ভারী কাজের বদলে মিনিমাল ডিজাইন-পাতলা বর্ডার, ছোট মোটিভ, হালকা এমব্রয়ডারি বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এসব শাড়ি দেখতে সাধারণ হলেও বেশ ক্লাসি।বরাবরের মতো এবারের ঈদেও বৈচিত্র্যপূর্ণ শাড়ির আয়োজন নিয়ে এসেছে ফ্যাশন ব্র্যান্ড কে ক্র্যাফট। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী খালিদ মাহমুদ খান জানান, এবার ঈদের দিন ও তার পরের দিনগুলোয় নানা সময়ে পরার উপযোগী করে বিভিন্ন ধরনের শাড়ির ডিজাইন করেছে কে ক্র্যাফট। তাঁর মতে, সুতি, মার্সেলাইজড কটন, হাফসিল্ক, র’ সিল্কে উইভিং ডিজাইন, প্রিন্ট বেজড বা মিক্সড মিডিয়া ওয়ার্কের শাড়িগুলো উৎসবে নিজের জন্য বা উপহার হিসেবে চমৎকার। খালিদ মাহমুদ জানান, এবারের কালেকশনে বেশ কিছু বিশেষ শাড়ি করা হয়েছে মিক্স মিডিয়ায়; যেখানে প্রিন্ট ও হাতের কাজ বা এমব্রয়ডারি কাজ করা হয়েছে। এ শাড়িগুলো অনুষ্ঠান উপযোগী ও উৎসবমুখী।রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি, ইস্টার্ন প্লাজা, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন শপিংমলের শাড়ি বিক্রেতারা জানান, এবারের ঈদে প্যাস্টেল কালারের শাড়ির মধ্যে হালকা গোলাপি, মিন্ট গ্রিন, ল্যাভেন্ডার, বেবি ব্লু–এ রংগুলো ট্রেন্ডে আছে। বিশেষ করে ঈদ একটু গরমে হওয়ায় হালকা রং বেশি পছন্দ করছেন সবাই। অরগাঞ্জা ও নেট শাড়িও আছে এবারের ঈদ ট্রেন্ডে। এ শাড়িগুলো মার্জিত হওয়ার পাশাপাশি বেশ উৎসবের আবহ তৈরি করে। এসব শাড়িতে হালকা এমব্রয়ডারি ও সিকুইন ওয়ার্ক বেশ নজর কাড়ছে। অন্যান্য শাড়ির পাশাপাশি কিছু ঐতিহ্যবাহী শাড়ি যেমন–জামদানির আবেদন সবসময়ই আছে। সফট প্যাস্টেল জামদানি এখন বেশি চলছে। ঈদে একটু ভারী শাড়ি চাইলে কিনতে পারেন কাতান বা সিল্ক। ঈদে বেনারসি স্টাইলে কাতানও অনেকে নিচ্ছেন পার্টি লুকের জন্য।এবারের ঈদে নানা ডিজাইনের শাড়ি এনেছে অনলাইন ব্র্যান্ড সরলা। ব্র্যান্ডটির স্বত্বাধিকারী মানসুরা ইয়াসমিন স্পৃহা জানান, এবার ঈদে পোশাকের উপকরণগুলো বেছে নিয়েছেন আবহাওয়া উপযোগী করে। খুব বেশি জমকালো নয়, বরং সাধারণ একটা ডিজাইন কতটা নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করা যায় সেই চেষ্টা করেছেন। ডিজিটাল প্রিন্ট মাধ্যমে মুন সিল্ক ম্যাটেরিয়াল, সেমি মসলিন ম্যাটেরিয়াল নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি আরও জানান, এবারের ঈদে শাড়িতে তাদের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে ‘ঢাকার গল্প-২’। গত বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছর তারা মতিঝিল থেকে সদরঘাট পর্যন্ত যে আইকনিক জায়গাগুলো আছে সেগুলোর ল্যান্ডস্কেপ তুলে ধরেছেন শাড়িতে। এসব ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে শাপলা চত্বর, টিকাটুলি, বাহাদুর শাহ পার্ক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামপুর কাপড়ের বাজার, শাঁখারীবাজার, সদরঘাটের লঞ্চঘাট, কাচের চুড়ির দোকান, ফুচকার দোকান, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার-দাবার, পুরান ঢাকার সংস্কৃতি যেমন–ছাদে ঘুড়ি উড়ানো, ছাদে বসে আড্ডা দেওয়া, একজন আরেকজনের বাড়িতে খাবার দেওয়া–এ বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ফোক মোটিভেও কাজ করা হয়েছে শাড়িতে। স্পৃহা জানান, এবার তারা শাড়িতে প্রচুর পরিমাণে ব্লকের কাজ করেছেন। কটন, হ্যান্ডলুম যে শাড়িগুলো আছে তাতে ব্লকের ডিজাইনে করা হয়েছে। তাছাড়া শাড়ির সঙ্গে পরার জন্য সরলার ফেক্সি স্টাইলের ব্লাউজগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়েছে এবার ঈদে। স্পৃহা বলেন, ‘কাস্টমাইজ করার অপশন থাকায় অনেকে নিজের শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের কাছে ব্লাউজের অর্ডার দিচ্ছে। এ ব্লাউজগুলো অনেক আরামদায়ক।’এবারের ঈদে নানা ধরনের শাড়ি নিয়ে এসেছে ফ্যাশন হাউস বিশ্বরঙ। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ও ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা জানান, ঈদের দিন সকালে সবাই একটা স্নিগ্ধ লুকে থাকতে চায়। এ সময় সংসারে অনেক ধরনের কাজকর্ম থাকে, আবার হালকা গরমও থাকতে পারে। সে জন্য সুতি বা হাফ সিল্কের শাড়ি রাখা হয়েছে। এ সময়ের জন্য করা হয়েছে সাদা বা হালকা রঙের শাড়ি। ঈদ ও ঈদের পরের কয়েকদিনের জন্য কিছু শাড়ি করা হয়েছে। এর মধ্যে হ্যান্ডলুম উল্লেখযোগ্য।তিনি আরও জানান, প্রতিটি উৎসবেই বিশ্বরঙ তাঁতের শাড়ির ওপরে আলাদা গুরুত্ব দেয়। এবার তাঁতের শাড়িতে নানা ধরনের ভ্যালু যোগ করা হয়েছে। ঈদের দিনগুলোয় সন্ধ্যারাতে অনেক পার্টি থাকে। একজন আরেকজনের বাসায় যায়, রেস্টুরেন্টে বা বাইরে দেখা-সাক্ষাৎ করে। এসব উপলক্ষকে কেন্দ্র করে গর্জিয়াস সিল্ক শিফন, মসলিন, অ্যান্টি সিল্ক, বলাকা সিল্ক, অরগাঞ্জা–এ ধরনের ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে শাড়িতে। অনেক শাড়িতে এমব্রয়ডারি, কারচুপি, ডিজিটাল প্রিন্ট যেমন আছে, তেমনি হ্যান্ড পেইন্টও আছে। কারচুপির সঙ্গে মিক্স মিডিয়াও পাবেন ক্রেতারা। ডিজাইনার বিপ্লব সাহা জানান, শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং অনেক ব্লাউজ এবং গহনা এমন করে বানানো হয়েছে, যা পরলে সাধারণ একটা শাড়িও অনেক বেশি গ্লসি দেখাবে। তিনি বলেন, আজকাল নারীর শাড়ি পরার প্রবণতা অনেক কমে গেছে। আমাদের চেষ্টা সেই চল ফিরিয়ে আনার। দেশীয় ঈদের শাড়ি কিনতে বিশ্বরঙ, রঙ বাংলাদেশ, কে ক্র্যাফট, অঞ্জন’স, আড়ং, নিপুণ, দেশাল, নাগরদোলা, সাতকাহন, হরীতকীতে যেতে পারেন। এ ছাড়া বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক, সীমান্ত স্কয়ার, শ্যামলী স্কয়ার, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, হকার্স মার্কেট, মৌচাক মার্কেটসহ আপনার নিকটবর্তী যে কোনো মার্কেট থেকেও কিনতে পারেন ঈদের শাড়ি। যে কোনো দেশীয় ব্র্যান্ড থেকে শাড়ি কেনা যাবে এক হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। চাইলে রাজধানীর হকার্স মার্কেট থেকে কম দামে বিভিন্ন ধরনের শাড়ি কিনতে পারেন।
আরও পড়ুন পরাজয় অথবা আরও আক্রমণের দোটানায় পড়েছেন ট্রাম্প
ঢাকাভয়েস/দি

No comments