মতপার্থক্য বনাম নারীর অবমাননা
একুশ শতকের এই সময়ে দাঁড়িয়ে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মহাকাশ জয়ের গল্প করার কথা, ঠিক তখনই আমাদের অনলাইন জগৎ নিমজ্জিত হয়েছে এক অন্ধকার গহ্বরে। ভিন্নমত বা আদর্শিক বিরোধকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার ক্ষমতা হারিয়ে কিছু গোষ্ঠী বেছে নিয়েছে ‘চরিত্রহনন’-এর এক নোংরা অস্ত্র। আর এই অস্ত্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন নারী- যিনি হতে পারেন একজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, শিল্পী কিংবা সাধারণ কোনো আন্দোলনকারী।
আমাদের সমাজে আজও একজন নারীকে হেয় করা মানে তার পুরো পরিবারকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া- এই মধ্যযুগীয় মানসিকতা আজও বহন করে চলেছে বেশির ভাগ নারী ও পুরুষ। আসলে আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে নারীদের শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। এখন তো যৌন হেনস্তা করাকেও কেউ আমলে নিচ্ছে না। এর মধ্যে অনলাইনে কোনো নারীর ব্যক্তিগত ছবি এডিটসহ কিংবা ছাড়াই ছড়িয়ে পড়লে তা হয়ে পড়ে টক অব দ্য টাউন। অথচ কোনো নারীর ছবি বা ভিডিও তার অনুমতি ছাড়াই এভাবে ভাইরাল করাটা যে অনৈতিক ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দণ্ডনীয় অপরাধ, সেসব যেন থোড়াই কেয়ার করছে নেটিজেনরা। বেগম রোকেয়া, তসলিমা নাসরিন, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, শেখ ও জিয়া পরিবারের যত নারী, হুমায়ূন আহমেদ পরিবারের নারী, মিডিয়ার সেলিব্রেটি যত নারী, যে কোনো আন্দোলনের নারী, লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও যে কোনো পেশাজীবী নারী, যে কোনো পোশাকের নারী, জীবিত কিংবা মৃত নারী- কাকে না নিয়ে আজেবাজে পোস্ট, এআই নির্মিত অসুস্থ ভিডিও, ছবি ভাইরাল করা হয়েছে? রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে পাল্টাপাল্টি পোস্ট করা হয় এসব! নিজের দলের নারী হলে তিনি শ্রদ্ধেয়, আর ভিন্নমতের নারী হলে তিনি ‘চরিত্রহীন’- এমন একপেশে ও অযৌক্তিক মনোভাব থেকেই অনলাইনে জন্ম নিচ্ছে নারী অবমাননাকারী অশ্লীল পোস্ট। এ এমনই বিশ্রী এক চর্চা- প্রায় সব মতবাদের অসুস্থ চিন্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। ন্যূনতম নৈতিকতারও কোনো পরোয়া করছে না কেউ। সামান্য মতপার্থক্য হলেই সেই নারীকে নিয়ে শুরু হয় নোংরামির চর্চা।
আগে অপপ্রচার সীমাবদ্ধ ছিল কিছু কুরুচিপূর্ণ কথায়। কিন্তু এখন এআই (অও) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে ডিপফেক ভিডিও বা এডিট করা ছবি, যা সাধারণ মানুষের চোখে আসল-নকল পার্থক্য করা কঠিন করে দেয়। এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পাল্টাপাল্টি নোংরামি করার যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে বাকস্বাধীনতা আজ লজ্জিত। ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার মানে এই নয়, অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা সম্মানে আঘাত করা! এটি সত্যিই আতঙ্কের যে, ভিন্নমত প্রকাশের জন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সেলিব্রেটি, বিভিন্ন পেশাজীবীর নারী ছাড়াও খুব সাধারণ আপনার, আমার, আমাদের যে কারোরই ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে রটনা ছড়িয়ে যেতে পারে যে কোনো সময়েই। সেক্ষেত্রে অনলাইনে নারীর নিরাপত্তা কোথায়? সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, যারা এই কুৎসিত কাজের হোতা, তারাই নারীদের অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ন, জেন্ডার সমতা, বাকস্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথার খই ফোটাচ্ছেন এবং দেখা যায়, এসব বিষয় নিয়ে তারা বেশ ভালোই বলেন! এমনকি অনেক সময় দেখা যায়, একজন নারী হয়েও অন্য নারীর বিরুদ্ধে এমন নোংরা প্রচারে লিপ্ত হচ্ছেন। একবারও আরেকজন নারীর সম্মানের দিকটি তারা আমলে নেন না, শুধু মতপার্থক্যের জন্য প্রতিহিংসার কারণে।
মতপার্থক্য থাকবেই, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই পার্থক্য যখন অশালীন ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়, তখন তা আর রাজনীতি বা আদর্শ থাকে না; তা হয়ে যায় অপরাধ। আমরা যদি এখনই এই ‘ডিজিটাল বুলিং’ এবং চরিত্রহননের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে আজ যাকে নিয়ে হাসাহাসি করা হচ্ছে, কাল সেই তালিকায় আমি, আপনি বা আমাদের পরিবারের কেউ যুক্ত হওয়াটা কেবল সময়ের ব্যাপার। মতপার্থক্যের লড়াইটি হওয়া উচিত প্রকৃত সত্য উন্মোচনের মাধ্যমে, যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে। এর বদলে নারীকে টার্গেট করে তার নামে অশ্লীলতা ছড়ানো বিকৃত কাপুরুষতারই নামান্তর। এই বিকৃতি কোনো রাজনৈতিক আদর্শ হতে পারে না।
তানিয়া কামরুন নাহার


No comments