দুই মাস বাড়তি দামে জ্বালানি তেল কিনতে হবে বাংলাদেশকে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ায় বিশ্ববাজারে কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি নিয়ে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন চলমান সংকট কাটতে সময় লাগবে। বিশেষ করে দাম নিয়ে সরকারের দুশ্চিন্তা থাকছেই। আরও অন্তত দুই মাস উচ্চ দামে জ্বালানি কিনতে হবে। এর মধ্যে যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠার আশঙ্কা আছে।যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে বড় প্রভাব পড়ে। সরকার প্রায় দ্বিগুণ দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেল আমদানি করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। তেলের সরবরাহও কমেছে। অন্যদিকে সরকারের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, যুদ্ধবিরতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; কিন্তু এটি স্থায়ী না হলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধ হলেই প্রকৃত স্বস্তি আসবে। তিনি জানান, যুদ্ধের কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বেশ কয়েকটি এলএনজিবাহী জাহাজ দেশে আসতে পারেনি। সেই ঘাটতি পূরণে খোলা বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি সংগ্রহ করতে হয়েছে। গতকাল বুধবারও একটি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় যেসব সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল, সেগুলো পুনরায় চালু করতে সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।সংকটের মধ্যেও গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে পেট্রোবাংলা কাজ করেছে উল্লেখ করে এরফানুল হক বলেন, এজন্য তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হয়েছে। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আভাস থাকলেও বড় উদ্বেগ হয়ে রয়েছে মূল্য নিয়ে। চুক্তিভিত্তিক এলএনজির মূল্য তাৎক্ষণিক বাজারদরে নয়, বরং আগের নির্দিষ্ট সময়ের গড় দামের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ মে মাসের আমদানির মূল্য নির্ধারিত হবে ১৬ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত গড় দামে। একইভাবে জুনের জন্য হিসাব করা হবে মার্চ-এপ্রিলের গড় মূল্য ধরে, যে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ছিল তুলনামূলক বেশি। এ কারণে আরও কিছুদিন উচ্চমূল্যের চাপ বহাল থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে সরবরাহ ও মূল্য উভয় ক্ষেত্রেই স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে সৌদি আরবের এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বোঝাই করা নরডিক পুলেক্স নামে একটি জাহাজ ২ মার্চ আটকে যায়। আরব আমিরাত থেকেও একটি জাহাজ আসেনি। বিপাকে পড়ে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা খুব একটা কাজে আসেনি। তবে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি কিছুটা বেড়েছে।বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, আগের চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিলে ১৭টি জাহাজ আসার কথা। এর মধ্যে ৭টি ডিজেলবাহী জাহাজ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে। সবকটি জাহাজ তেল নিয়ে না এলে বিপাকে পড়তে পারে বাংলাদেশ।জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, যুদ্ধ বিরতিতে জ্বালানি খাতে স্বস্তি আশা করছি। কিন্তু কতটা স্বস্তি হবে, তা বোঝা যাবে আরও দু-এক দিন পর। আমরা আমাদের সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ১৬ ডলার কমে এসেছে। সুতরাং দামে স্বস্তি এসেছে। দাম আরও কমে এলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হলে কেবল পুরোপুরি স্বস্তি মিলবে।
এলসি ও জামানত জটিলতা
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার পর মার্চ ও এপ্রিল মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ টন জ্বালানি তেল টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া এই উদ্যোগ এখনও কার্যকর হয়নি। এলসি খোলা ও পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (জামানত) জটিলতায় আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।যুদ্ধ শুরুর পর মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহে সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় ৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৯ লাখ ৮৫ হাজার টন তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয় ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এর আগে দুই লাখ ২০ হাজার টন পরিশোধিত তেল আমদানির পৃথক প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু অনুমোদনের প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো এলসি খোলা হয়নি, দেশে আসেনি তেল।নিয়ম অনুযায়ী, এলসি খোলার আগে সরবরাহকারীদের ৫ শতাংশ পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত ৯টির মধ্যে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান আংশিক জামানত জমা দিয়েছে, সেটিও শর্ত অনুযায়ী ডলারের পরিবর্তে টাকায়, যা গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ফলে কার্যত স্থবির হয়ে আছে আমদানি প্রক্রিয়া।এদিকে সরকার স্পট মার্কেট থেকে আরও প্রায় সাত লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দেয়। তবে এক্ষেত্রেও একই চিত্র। নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার পরও বেশির ভাগ সরবরাহকারী প্রয়োজনীয় জামানত জমা দেয়নি।সংশ্লিষ্টরা জানান, অনুমোদন পাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তেল সরবরাহ সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে অস্বাভাবিক কম দামে প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলারে ডিজেল দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, যদিও বাজারদর ২০০ ডলারের বেশি। এতে প্রস্তাবগুলোর বাস্তবতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
পাম্পে তেল নিতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে
রাজধানীসহ সারাদেশে জ্বালানি তেল সংগ্রহ এখন এক চরম ভোগান্তির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে অস্বাভাবিক যানজট, স্থবির হয়ে পড়ছে চলাচল। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও কোথাও এই লাইন কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। এতে সড়কের একাধিক লেন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। বিজয় সরণি, মহাখালী, উত্তরা, আবদুল্লাহপুর, মিরপুর, বাড্ডা, তেজগাঁও, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাম্পের সামনে সারিবদ্ধ যানবাহন মূল সড়ক দখল করে রেখেছে। এতে গণপরিবহন আটকে যাচ্ছে, যাত্রীরা বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক পাম্পে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকা সত্ত্বেও অজুহাত দেখিয়ে সীমিত সংখ্যক নজেল চালু রাখা হচ্ছে। এতে গাড়িতে তেল নিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তেল মজুতের প্রবণতা এবং বোতল-ড্রামে তেল নেওয়ার কারণে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।রাজধানীর বাইরেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। রাজবাড়ীতে তেল সরবরাহের খবরে সকাল থেকেই পাম্পগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন কৃষক, পরিবহন চালক ও ব্যবসায়ীরা। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেল না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক। বাধ্য হয়ে লিটারপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। এতে সেচ খরচ বেড়েছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।নাটোরে গোপনে তেল বিক্রি করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি নাটোরে পাম্পে তেল নেওয়ার সিরিয়ালকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং একজনকে আটক করেছে পুলিশ। ফেনী ও ফরিদপুরে অবৈধ মজুত ও বেশি দামে বিক্রির সময় তেল জব্দ করা হয়। জরিমানাও করা হয়েছে। অনেক এলাকায় খুচরা বাজারে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় দোকান বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ফিলিং স্টেশনে বোতলে অকটেন সরবরাহকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও র্যাবের উপস্থিতিতেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত তিনজন আহত হন। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি ফিলিং স্টেশনে কালোবাজারি ও অনিয়ম ঘিরে সংঘর্ষে নারীসহ অন্তত সাতজন আহত হন।
সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির আহ্বান
দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগের পর সব পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাকে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রির আহ্বান জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি)। গতকাল সংগঠনটির সভাপতি আমিরুল হক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গত ৭ এপ্রিল পাঠানো পত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রাহক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এলপিজি বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান হতে সরকার নির্ধারিত মূল্যেই সিলিন্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে।সবশেষ দেশের বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম বাড়ে গত ২ এপ্রিল। সেদিন প্রতি কেজি এলপিজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা দাম বাড়ানো হয়। এতে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম হয়েছে এক হাজার ৭২৮ টাকা।
যুদ্ধবিরতিতে তেলের দাম কমেছে
যুদ্ধবিরতির খবরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে। কমেছে তেলের দাম, বেড়েছে শেয়ারবাজারের সূচক। বিবিসি জানায়, বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৮০ ডলারে নেমেছে। এর প্রভাবে এশিয়া ও ইউরোপের পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল হলে বাজারে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।
আরও পড়ুন ৩ মে সারাদেশে মিলবে হামের টিকা
ঢাকাভয়েস/এই

No comments