বিল পাস, নিষিদ্ধ থাকছে আ.লীগের কার্যক্রম
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে হুবহু বিল আকারে পাস হয়েছে। এই অধ্যাদেশের অধীনে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সব অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটি সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশটি সংশোধন করে শাস্তিযোগ্য বিধান যুক্ত করতে সুপারিশ করেছিল। তবে সংসদে উত্থাপিত বিলে তা করা হয়নি।পাস হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’টি রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর আইনে পরিণত হবে। ফলে সরকার নির্বাহী আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। বিলটি পাস হওয়ার পর নতুন করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি এবং এর ভবিষ্যৎ কার্যক্রম আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগ এই বিল পাসের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদে বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান আপত্তি জানান। তিনি বলেন, ‘বিলের কপি মাত্র তিন থেকে চার মিনিট আগে হাতে পেয়েছি। এটি পুরো পড়তে পারিনি। স্পর্শকাতর বিলটি পাসের আগে একটু সময় দেওয়া হোক।’ জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আপত্তি জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময় আপত্তি হলে গ্রাহ্য করতে পারতেন। বিল উত্থাপনের পর্যায়ে আপত্তির সুযোগ নেই। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, বিলটি একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ-সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের যে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ছিল, মূলত তার সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতার নিশ্চয় স্মরণ থাকার কথা, তারা এবং এনসিপির বন্ধুরা মিলে একটি আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলনে বাংলাদেশে একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধনও স্থগিত হয়ে আছে। এ আইনে পরবর্তী সময়ে ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে সংগঠনের বিচারে বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেই অধ্যাদেশের বিলও পাস হয়েছে। গতকাল দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আওয়ামী লীগ বলেছে, অধ্যাদেশটি পাসের মাধ্যমে মহান সংসদ কলঙ্কিত হয়েছে। কারণ সংসদ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিল পাস করেছে। একে ন্যক্কারজনক ঘটনা অভিহিত করে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দলটি।
শাস্তির বিধান ছাড়াই পাস
বিশেষ কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ পরিবর্তন ছাড়াই পাসের সুপারিশ করে। আর ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে পাসের সুপারিশ করেছিল। সংশোধনের তালিকার ৪ নম্বরে ছিল ২০২৫ সালের ১১ মে জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’। তবে সরকারি দল এ অধ্যাদেশ সংশোধন ছাড়া পাসের জন্য গতকাল সংসদে উত্থাপন করে। এ অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে ২০০৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ এবং ২০ ধারা সংশোধন করে গত বছর আওয়ামী লীগ এবং দলটির সব সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্রলীগকে। তবে সংশোধন ছাড়াই পাস করায় অন্তর্বর্তী সরকারের ৯৯টি অধ্যাদেশকে হুবহু পাস করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো দল ও সংগঠনকে সন্ত্রাসী সত্তা হিসেবে গণ্য করে নিষিদ্ধের ক্ষমতা দেওয়া হয় সরকারকে। এনসিপি নেতারা গত বছরের ৯ মে রাতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনার কাছে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। পরে এতে জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন দল যোগ দেয়।১১ মে রাতে যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি ধারা সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই দিনে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে সরাসরি নিষিদ্ধ করেনি। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় অধ্যাদেশের ২০ ধারা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ মিছিল-সভা-সমাবেশ করতে পারবে না; দলটির কার্যালয় বন্ধ থাকবে; ব্যাংক হিসাব জব্দ হবে; পোস্টার-ব্যানার প্রচার করতে পারবে না; সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিতে পারবে না; গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তা প্রকাশ করা যাবে না এবং সংবাদ সম্মেলন করতে পারবে না। তবে এসব কার্যক্রম করলে কী শাস্তি হবে– বলা হয়নি এ অধ্যাদেশে।
জাতির পিতার পরিবারের নিরাপত্তা বাতিল
গতকাল সংসদে জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা বাতিল অধ্যাদেশও পরিবর্তন ছাড়া কণ্ঠভোটে পাস করা হয়। সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষ এ বিলে সমর্থন জানায়। এ ছাড়া আরও ১০টি বিল পাস হয়েছে গতকাল। এগুলো হলো– সরকারি হিসাব নিরীক্ষা বিল, প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল, স্থানিক পরিকল্পনা বিল, পরিত্যক্ত বাড়ি সম্পূরক বিধানাবলি (সংশোধন) বিল, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (রহিতকরণ) বিল, কোড অব সিভিল প্রসিডিওর (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল এবং শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, জামালপুর (সংশোধন) বিল সংসদে পাস হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনে (১৩ মার্চ) সংসদে উত্থাপন করা হয়। সেদিন গঠিত ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হলে ৩০ দিন তথা ১১ এপ্রিল থেকে তা কার্যকারিতা হারাবে।
আরও পড়ুন দুই মাস বাড়তি দামে জ্বালানি তেল কিনতে হবে বাংলাদেশকে
ঢাকাভয়েস/এই

No comments