Adsterra

লোড হচ্ছে...

সমীকরণ বদলে দিতে পারেন অবাঙালি ভোটার


সমীকরণ বদলে দিতে পারেন অবাঙালি ভোটার,ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News

ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর) আসনে বাঙালির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবাঙালি বিহারি ভোটার রয়েছেন। শুধু মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পেই ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। মোট বিহারি ভোটার অর্ধলক্ষাধিক। পাশাপাশি শিয়া সম্প্রদায়, হিন্দু ও খ্রিষ্টান ভোটারও রয়েছেন কয়েক হাজার। তারাই ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারেন।

এই আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। বিপরীতে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রিকশা প্রতীক নিয়ে আছেন খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। জোটের কারণে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা আগেই সরে দাঁড়িয়েছেন। 

ফলে দুই প্রার্থীর ভোটের লড়াই হয়ে উঠেছে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। একদিকে সংগঠিত ধর্মীয় ও মাদ্রাসাভিত্তিক নেটওয়ার্ক; অন্যদিকে প্রচলিত রাজনৈতিক ভোটব্যাংক, পারিবারিক যোগাযোগ ও দলীয় প্রতীকের শক্তি।ঢাকা-১৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৯ হাজার ৮১২, নারী ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৭১ এবং হিজড়া ৮ জন। নির্বাচন কমিশনের বিধিমালার কারণে এনডিএম থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন ববি হাজ্জাজ। মাঠে তাঁর প্রচারণার বড় ভরসা স্ত্রী ব্যারিস্টার রুশনা ইমাম। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছেন তিনি। তবে স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকে খুব একটা সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর।

বিপরীতে মামুনুল হকের মাঠের প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে নিজস্ব কর্মী ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। রিকশা প্রতীকের পক্ষে তিনি এলাকায় ‘জাগরণী পদযাত্রা’ চালাচ্ছেন।স্থানীয় ব্যবসায়ী নূরে আলম বলেন, এই আসনে মূল লড়াই হবে মামুনুল হক আর ববি হাজ্জাজের মধ্যে। দুজনই আলাদা আলাদা কৌশলে মাঠে কাজ করছেন।গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের সরু গলি, আদাবরের বাজারপাড়া আর বছিলার বেড়িবাঁধ– সবখানে এখন একই দৃশ্য। একপাশে রিকশা প্রতীকের মিছিল। সামনে সারি সারি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। হাতে ব্যানার-ফেস্টুন। অন্যপাশে ধানের শীষের ব্যানার-ফেস্টুন। 

মামুনুল হকের প্রচারণায় সংগঠিত কর্মীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। তাঁর নিজস্ব মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় অনুসারী নিয়ে গড়ে ওঠা কাঠামো। মোহাম্মদপুরের একাধিক এলাকায় দেখা যায়, সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা দলে দলে বের হচ্ছে। কারও হাতে লিফলেট, কারও হাতে ব্যানার। অনেক জায়গায় স্থানীয় মসজিদ ও মাদ্রাসা ঘিরে প্রচারণার কেন্দ্র তৈরি হয়েছে।

মামুনুল হকের সমর্থক এক মাদ্রাসাশিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ওস্তাদ আমাদের বলেছেন, এটা শুধু নির্বাচন না, এটা এলাকার নেতৃত্বের প্রশ্ন। আমরা নিজেরা সময় দিয়ে মাঠে আছি।’

এই নেটওয়ার্কের বড় সুবিধা হলো–এটি স্বতঃস্ফূর্ত। কোথায় কখন মিছিল হবে, কোন এলাকায় কারা দায়িত্বে থাকবেন–এসব আগেই ঠিক করা থাকে। ফলে মাঠে মামুনুল হকের উপস্থিতি দৃশ্যমান, নিয়মিত এবং সংখ্যায় বড়। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতের দোকানি আব্দুর রহমান বলেন, ‘মামুনুল হকের লোকজন একসঙ্গে নামে। সংখ্যায়ও বেশি মনে হয়। প্রতিদিনই দেখি মিছিল যাচ্ছে।’

মামুনুল হক বলেন, ‘আমার সঙ্গে এলাকার মানুষ আছে। আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। স্বাভাবিকভাবেই এখানে আমার অবস্থান শক্ত।’

এর বিপরীতে ববি হাজ্জাজের প্রচারণার ধরন আলাদা। মাঠে বড় মিছিল কম, কিন্তু বাড়ি বাড়ি যাওয়া, মতবিনিময় সভা, ব্যক্তিগত পরিচিতি–এই কৌশলের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন তিনি। সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ তাঁর স্ত্রী ব্যারিস্টার রুশনা ইমাম। বাজার, পাড়া-মহল্লা, নারী ভোটারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন তিনি। গতকাল মোহাম্মদপুর বাজারে পিঠা বিক্রেতার কাছে ভোট চাইতে দেখা যায় তাঁকে। তিনি বলেন, ‘নারীদের বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির সমস্যা সবচেয়ে বড়। আমরা তিতাস, ওয়াসা ও ডেসকোর সঙ্গে নিয়মিত বসব। নির্বাচিত হলে প্রতি মাসে টাউন হল মিটিং করব।’

মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকার গৃহবধূ রাবেয়া বেগম বলেন, ‘ম্যাডাম নিজে এসে কথা বলছেন। গ্যাস-পানি নিয়ে কথা বলছেন। এভাবে সরাসরি কথা আগে কেউ বলেননি।’

ববি হাজ্জাজের বড় শক্তি ধানের শীষ প্রতীক এবং বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক। বিশেষ করে অবাঙালি বিহারি ভোটার, কিছু পুরোনো বিএনপি সমর্থক পরিবার এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশ তাঁর দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিকরা। তবে স্থানীয় অনেকেই বলছেন, বিএনপির অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যে খুব সক্রিয় নন।

স্থানীয়দের মতে, মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন মাঠে শক্তিশালী হলেও সেটি সবসময় ভোটে সমানভাবে রূপ নেয় না। আবার ভোটব্যাংক অনেক সময় মাঠে দুর্বল দেখালেও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের স্কুলশিক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, ‘মাঠের মিছিল আর ভোটের বাক্সের হিসাব এক জিনিস না। ধর্মীয় সংগঠনের মাঠ শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু শহুরে আসনে নীরব ভোটার বড় ভূমিকা রাখে।’

ঢাকা-১৩ আসনের রাজনীতিতে জেনেভা ক্যাম্প একটি বড় নিয়ামক। স্থায়ী পুনর্বাসনই এখানকার প্রধান দাবি। এখানে বিহারি ভোটারের বড় অংশ রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়, মাদ্রাসাভিত্তিক যোগাযোগ এবং সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্কের কারণে মামুনুল হকের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ থাকলেও বিএনপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পের ব্যবসায়ী মাহফুজুল হক বলেন, ‘আমাদের কাছে দল বড় নয়, পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি বড়। যে বিশ্বাসযোগ্যভাবে কথা বলবে, তাকেই ভোট দেব।’

স্ট্রান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির (এসপিজিআরসি) এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সব সরকার আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক নিরীহ মানুষের নামে মামলা হয়েছে। আমরা ক্যাম্পে একধরনের বন্দি জীবনযাপন করি। লোক দেখানো মাদকবিরোধী অভিযান হয়, কিন্তু মাদক বেচাকেনা বন্ধ হয় না।’ তাঁর মতে, যেসব প্রার্থীর ইশতেহারে পুনর্বাসনের বিষয়টি বাস্তবভাবে থাকবে, তারাই ক্যাম্পের ভোট পাবেন।

মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় বাসিন্দাদের প্রধান উদ্বেগ কিশোর গ্যাং, মাদক ও ছিনতাই। পাশাপাশি দখল, ফুটপাতে অবৈধ দোকান এবং যানজট নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ী লিটন সরকার বলেন, ‘২০২৩ সালে আগুনে পুড়ে যাওয়া কৃষি মার্কেট এখনও ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা কিছুই পাননি। নির্বাচিত এমপির কাছে আমাদের বড় দাবি থাকবে–এই মার্কেট নতুন করে গড়ে তোলা।’

লালমাটিয়ার কলেজছাত্র আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আগে তো কখনও এমপিদের এলাকায় দেখিনি। এবার চাই তরুণরা বেশি বেশি আসুক।’

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘আমি এই এলাকার সন্তান। দীর্ঘদিন বহিরাগতরা প্রতিনিধিত্ব করেছেন। স্থানীয় হওয়ায় মানুষ আমাকে আপন মনে করছে। চাঁদাবাজি ও মাদক নির্মূলের পাশাপাশি কিশোর গ্যাং সদস্যদের সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দেব।’ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে এবং এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করতে হলে ভোটারের উচিত আমাকে ভোট দেওয়া। সন্ত্রাস, যানজট, ড্রেনেজ, গ্যাস-পানির সংকট–এসবই বড় সমস্যা। এরই মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তা সেল, সিসিটিভি স্থাপন, এলাকাবাসীর জন্য একটি অ্যাপ চালু এবং খাল পরিষ্কার ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুন    খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের সংসদে শোক প্রস্তাব

ঢাকাভয়েস/এই

 

No comments

Powered by Blogger.