স্বাগত ২০২৬
আজকের নতুন সূর্য ভোরের আলো ছড়িয়ে দিতে দিতে জানান দিল– খ্রিষ্টীয় আরও একটি বছরের পথচলা শুরু। সময়ের ধারাবাহিকতায় নতুন বছরে পদার্পণের মধ্য দিয়ে মানুষের মনে জেগে ওঠে নতুন আশা, স্বপ্ন আর নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। পৌষের কুয়াশা ভেদ করে সোনালি আলোর যে সকাল আজ উদ্ভাসিত, তা আমাদের হাতছানি দিচ্ছে বিপুল সম্ভাবনার পথে।
গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা অনুযায়ী আজ বৃহস্পতিবার শুরু হলো নতুন বছর, ২০২৬। বিশ্ববাসী পা রাখল নতুন একটি বছরে, আর বাংলাদেশ একই সঙ্গে প্রবেশ করল স্বাধীনতা অর্জনের ৫৫তম বছরে। নববর্ষ মানেই কেবল উৎসব নয়– এ এক আত্মসমালোচনার ক্ষণ, পেছন ফিরে তাকিয়ে হিসাব মেলানো এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিক নির্ধারণের সময়।
নতুন বছরের সূচনায় আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি ফিরে তাকানো প্রয়োজন বিগত দিনের দিকে। ঠিক এক বছর আগে যেমন আমরা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব কষেছিলাম, ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বপ্নকে নতুন করে সাজাতে চেয়েছিলাম– আজও আমাদের মন সেই একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়। আমরা কি পারছি আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার সেতুবন্ধ ঘটাতে? আমরা কি শিখতে পারছি আমাদের ভুলগুলো থেকে?
আজকের প্রভাত যে উজ্জ্বল সূর্য নিয়ে এলো, তা আমাদের জন্য কী বার্তা বহন করছে? ২০২৬ সাল কি খুলে দেবে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার? মানুষের হৃদয়ে বরাবরই নতুন বছরকে ঘিরে থাকে স্বপ্নের রঙিন ক্যানভাস– একটি আলোকিত পথের আকাঙ্ক্ষা; যেখানে থাকবে না হতাশা, বঞ্চনা আর ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস। আমরা চাই না ধ্বংসাত্মক রাজনীতি, চাই না হানাহানি, সংঘাত আর মৃত্যুর মিছিল। অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অগণতান্ত্রিক আচরণ থেকে সরে এসে শান্ত, সহনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের চেষ্টাই হোক নতুন বছরের অঙ্গীকার।
নতুন বছরের প্রথম দিকেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন ঘিরে জাতির দৃষ্টি এখন গণতন্ত্রে উত্তরণ ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ায় নিবদ্ধ। মানুষের প্রত্যাশা– এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আগামী পাঁচ বছর শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ, স্থিতিশীল অর্থনীতি ও সুস্থ সামাজিক কাঠামো নিশ্চিত হবে। একটি গ্রহণযোগ্য, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই পারে জাতিকে সেই পথে এগিয়ে নিতে।
বছরের প্রথম দিনেই দেশের প্রায় সাড়ে চার কোটি শিশু হাতে পেতে শুরু করবে বিনামূল্যের পাঠ্যবই। এ এক বিশাল অর্জন ও আনন্দের সংবাদ। শিক্ষা খাতে অগ্রগতির এই চিত্র আশাব্যঞ্জক হলেও আমাদের পথচলা অনেক দীর্ঘ। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বরাদ্দ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। ধীরে হলেও নতুন বছরে সে পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা মানুষের।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও নতুন বছরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট। মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যেন অসহনীয় বোঝা হয়ে না চাপে। দিন আনে দিন খায়– এমন মানুষও যেন খেয়ে-পরে সম্মানের সঙ্গে শান্তিতে বাঁচতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার।
নগরজীবনের আরেক বড় দুর্ভোগ যানজট। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার যানজট দেশের অমূল্য কর্মঘণ্টা নষ্ট করছে। যানবাহনের গড় গতি আর মানুষের হাঁটার গতি প্রায় সমান হয়ে পড়া কোনো সভ্য নগরের পরিচয় হতে পারে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত ও সাহসী উদ্যোগ– ফুটপাত দখলমুক্ত করা, গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার এবং নগর পরিকল্পনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
জনমানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা অবশ্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্রহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘাত যেন আর ফিরে না আসে। নারীর প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি আরও মানবিক হোক, আইনের শাসন হোক প্রশ্নাতীত।
প্রত্যাশা যেমন বিপুল, বাংলাদেশের সম্ভাবনাও তেমনই অসীম। বিদায়ী বছরে ছিল নানা চড়াই-উতরাই। নতুন বছরে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে যেন সুসমন্বয় ঘটে– এ কামনা দেশের প্রত্যেকের। ২০২৬ হোক আত্মশুদ্ধির বছর, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তার বছর। আলোকিত, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকারের বছর।
আরও পড়ুন বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক খালেদা জিয়া
ঢাকাভয়েস/এই

No comments