পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে শক্তিশালী সৌরঝড়
মহাকাশ আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, একটি তীব্র সৌরঝড় খুব শিগগির পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (নোয়া) জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে সূর্য থেকে একাধিক করোনাল ভর নির্গমন (সিএমই) ঘটেছে, যা দ্রুত সময়ের মধ্যে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় সৃষ্টি হয়ে রেডিও, জিপিএস ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
কীভাবে সৃষ্টি হয় অরোরা
এই সৌরঝড়ের ফলে আকাশে রঙিন অরোরা বা উত্তরের আলো দেখা যেতে পারে। অরোরার উজ্জ্বলতা ও কতদূর দক্ষিণে তা দেখা যাবে, তা নির্ভর করবে সৌর বিস্ফোরণের সময় ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে তার পারস্পরিক ক্রিয়ার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছাড়াও আলাবামা ও উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দক্ষিণে অরোরা দৃশ্যমান হতে পারে।
সূর্য বর্তমানে তার ১১ বছরব্যাপী কার্যকলাপ চক্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এ সময় সূর্য থেকে নির্গত চার্জিত কণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষ করলে মেরু অঞ্চলের কাছে অরোরা সৃষ্টি হয়। সূর্যের চৌম্বক মেরুর অবস্থান পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অপেক্ষাকৃত দক্ষিণাঞ্চলেও অরোরা দেখা যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত সূর্যের এই সক্রিয়তা অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে অরোরা দেখতে আগ্রহীদের জন্য বিশেষজ্ঞরা শহরের আলো থেকে দূরে অন্ধকার ও খোলা জায়গায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। নোয়ার স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টারের ওয়েবসাইট বা অরোরা পূর্বাভাস অ্যাপে সর্বশেষ তথ্য জানা যাবে। আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে স্মার্টফোন ক্যামেরার মাধ্যমে অনেক সময় এমন অরোরা ধরা পড়ে, যা খালি চোখে স্পষ্ট দেখা যায় না।
সৌরঝড়ের প্রভাব কতটা ভয়াবহ
সৌরঝড় কেবল দৃষ্টিনন্দন অরোরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দ্রুতগতির সৌরকণা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে আঘাত করলে বিদ্যুৎ গ্রিডে সাময়িক বিপর্যয়, বিমান চলাচলের রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন এবং উপগ্রহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে, ১৮৫৯ সালের ক্যারিংটন ঘটনায় টেলিগ্রাফ লাইনে আগুন ধরে যায় এবং ফ্লোরিডা পর্যন্ত অরোরা দেখা গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে যেকোনো মুহূর্তে একই মাত্রার ঝড় হলে মহাদেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটতে পারে।
ধ্বংস হতে পারে স্যাটেলাইট ব্যবস্থা
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে আরও ভয়াবহ আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, একটি বড় সৌরঝড়ের কারণে মাত্র তিন দিনের মধ্যেই পৃথিবীর স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। বর্তমানে নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথে প্রায় ১৪ হাজার স্যাটেলাইট রয়েছে, যেখানে ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় চার হাজার। কক্ষপথে অতিরিক্ত যানজটের ফলে ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সৌরঝড়ের কারণে যদি স্যাটেলাইট অপারেটররা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, তবে মাত্র ২.৮ দিনের মধ্যেই একের পর এক সংঘর্ষ শুরু হয়ে ‘কেসলার সিনড্রোম’ নামে পরিচিত ধ্বংসাত্মক শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এতে জিপিএস ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে মহাকাশ ব্যবহারের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।


No comments