
জুলাই-আগস্ট হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা হবে, তাই সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালে ছিল ভিড়। এজলাসে বসে রায় শুনতে এসেছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। কৃত্রিম পায়ে ভর করে আসেন জুলাইযোদ্ধারা। সাংবাদিক, আইনজীবী, আন্দোলনকারীরাও ছিলেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়।দুপুর সাড়ে ১২টায় ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা এজলাসে বসেন। কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে পৌনে ১টায় রায় পড়া শুরু হয়। বেলা পৌনে ৩টার দিকে রায়ের শেষ দিকে শেখ হাসিনার সাজা ঘোষণা করা হয়– মৃত্যুদণ্ড। সঙ্গে সঙ্গে এজলাস সরগরম হয়ে ওঠে করতালি, উল্লাস আর উচ্ছ্বাসে। কান্নায়ও ভেঙে পড়েন কয়েকজন শহীদের স্বজন। রায়ের পর আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা শামসী আরা জামান বলেন, শেখ হাসিনা যেমন তাঁর বাবার হত্যাকারীদের সাজা কার্যকর দেখেছেন; তেমনি আমিও সন্তানহারা মা হিসেবে তাঁর সাজা দেখতে চাই। মোহাম্মদপুরে শহীদ শিক্ষার্থী মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী রায়ের পর আবেগতাড়িত হয়ে যান। এজলাসে চোখ মুছতেও দেখা যায় তাঁকে। বের হয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রিয়জনকে হারিয়েছি, কেউ দৃষ্টি হারিয়েছেন, কেউ পা হারিয়েছেন। এই ক্ষতি তো পূরণ হওয়ার নয়। এর জন্য দায়ীদের সাজা কার্যকর হলে আমরা নিজেদের সান্ত্বনা দিতে পারব।শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, দণ্ডিতদের দেশে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করা পর্যন্ত এ রায় অর্থহীন। আমাদের আবেদন থাকবে, যত দ্রুত সম্ভব তাদের সাজা কার্যকর করুন। সেই সঙ্গে এটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, ভবিষ্যতে যারা দেশ পরিচালনা করবেন, তারা যেন কখনও জনগণের বিরুদ্ধে না দাঁড়ান। মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ ও তার দোসর জাতীয় পার্টি, ১৪ দলীয় জোট– সবাইকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। রায় উপলক্ষে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ ও ট্রাইব্যুনালের সামনের এলাকায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, এপিবিএনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন সতর্ক পাহারায়। রায় ঘোষণার পরপরই হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ ও ট্রাইব্যুনালের সামনে অপেক্ষারত জুলাইযোদ্ধাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন। এ সময় গণঅধিকার পরিষদ, জুলাই মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিয়ে রায়কে স্বাগত জানান, মিষ্টি বিতরণ করেন।এজলাসের বাইরে দেখা গেল শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব ও জাহিদুর রহমান সোহাগের বোন নাজমা খাতুন সাথীকে। তারাও রায়ে সন্তুোষ প্রকাশ করলেন। সেই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে দ্রুত দেশে এনে সাজা কার্যকরের দাবি জানালেন। অভ্যুত্থানের সময় গুলিতে দৃষ্টিশক্তি হারানো রহমত উল্লাহ ও সাব্বির আহমেদ এবং বাঁ পা হারানো জাকির সিকদার জানান, দীর্ঘ চিকিৎসায় জীবন ফিরে পাওয়ায় তারা যতটা খুশি, তার চেয়ে বেশি খুশি হবেন যদি শেখ হাসিনার সাজা কার্যকর হয়।
প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি
ট্রাইব্যুনাল চত্বরের বাইরেও ভিড় করেছিল অনেক শহীদ পরিবার। তাদের মধ্যে শহীদ সৈয়দ মুনতাসির রহমানের বাবা সৈয়দ গাজীউর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা যে গুম-খুনের অপরাধ করেছেন, তাতে তাঁর ১৪ হাজারবার ফাঁসি দিলেও শেষ হবে না। তবে মানুষকে তো একবারের বেশি ফাঁসি দেওয়া সম্ভব না। আমার চাওয়া– এই ফাঁসিটা যেন দৃষ্টান্তমূলক হয়, প্রকাশ্যে হয়।বাড্ডায় শহীদ হাফিজুল শিকদারের বাবা আবু বকর সিদ্দিকও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে বাংলার মাটিতে ফাঁসি দিলে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। সাভারে শহীদ শিক্ষার্থী নাফিসা হোসেন মারওয়ার বাবা আবুল হোসেন বলেন, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ আমার মেয়েকে গুলি করে মেরে ফেলে। এই ঘটনায় যারা গুলি করেছে, যারা হুকুম দিয়েছে– সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখে যেতে চাই: আবু সাঈদের বাবা
শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। তার মতো হাজার হাজার মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অনেকে হাত-পা হারিয়েছে, পঙ্গু হয়েছে, কারও চোখ নষ্ট হয়েছে। তাই শুধু রায় ঘোষণা করেই যেন শেষ না হয়। আমি বেঁচে থাকতেই যেন ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখে যেতে পারি।সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ছেলেকে হারিয়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। আর যেন কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।
রায় কার্যকর হলে ছেলের আত্মা শান্তি পাবে
চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফি আলম বলেন, সন্তান তো আর ফিরে পাবো না। খুনিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হলে আমার সন্তানের আত্মা শান্তি পাবে।আরেক শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্তর মা কোহিনুর আক্তার বলেন, শেখ হাসিনার একবার ফাঁসিতে শহীদের আত্মা শান্তি পাবে না। তাঁকে বারবার ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
আরও পড়ুন শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা, দিল্লির সাদামাটা প্রতিক্রিয়া
ঢাকাভয়েস/এই
No comments