Adsterra

লোড হচ্ছে...

তিন মামলায় শেখ হাসিনার ২১ বছর কারাদণ্ড



তিন মামলায় শেখ হাসিনার ২১ বছর কারাদণ্ড, ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News

পূর্বাচলে প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে এক মামলায় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে আরেক মামলায় পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন গতকাল বৃহস্পতিবার তিন মামলার রায় ঘোষণা করেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঢাকা শহরে বাড়ি বা ফ্ল্যাট বা আবাসন থাকা সত্ত্বেও ‘তথ্য গোপন করে তারা আইন ভেঙে দুর্নীতির মাধ্যমে’ পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার তিনটি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। পৃথক এই তিন মামলায় আসামি ৪৭। তবে ব্যক্তি হিসেবে এ সংখ্যা ২২।জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এবার তাঁকে দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হলো। গত ১০ দিনের ব্যবধানে দুই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হলেন এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী।শেখ হাসিনা ও তাঁর দুই সন্তান ছাড়াও এ তিন মামলায় আরও ২১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামি রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আত্মসমর্পণ করায় তাঁকে লঘু শাস্তি হিসেবে এক বছর করে তিন মামলায় তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে, মেয়েসহ বাকি আসামিদের পলাতক দেখিয়ে গত ৩১ জুলাই এ মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। আত্মপক্ষ সমর্থন না থাকায় তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।আদালতে শেখ হাসিনা পরিবারের বিরুদ্ধে তিন মামলায় দুদকের পক্ষে শুনানি করেন খান মো. মাইনুল হাসান লিপন। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। এ আইনজীবী বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন চেয়েছিলাম, তা হয়নি। কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

রায়ের পর্যবেক্ষণ

এদিন আদালতে বিচারক রায় দেওয়ার সময় মিথ্যা তথ্য দিয়ে শেখ হাসিনার রাজউকের প্লট নেওয়াকে ‘জাতির জন্য বড় ধাক্কা’ বলে উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে বিচারক শেখ হাসিনার সম্পদের প্রতি লোভ আছে বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী। কিন্তু তাঁর স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার নামে ১৯৭২ সালে বরাদ্দ পাওয়া প্লটের বিষয়টি গোপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁর নামে কোনো বরাদ্দ নেই।’ প্লট বরাদ্দ পেতে শেখ হাসিনার দেওয়া দুটি এফিডেভিটের কোনো মূল্য নেই বলে উল্লেখ করেন। বিচারক বলেন, ‘প্লট বরাদ্দের জন্য রাজউক বা সরকারি/আধা সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ার বিষয়ে এফিডেভিট দিতে হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার দেওয়া দুটি এফিডেভিটই নোটারির প্রত্যায়িত হয়নি, ম্যাজিস্ট্রেটের সই নেই।’ পাবলিক প্রপার্টির প্রতি শেখ হাসিনার লোভাতুর দৃষ্টি আছে উল্লেখ করে বিচারক বলেন, ‘তিনি চারবারের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কেন প্লট বরাদ্দ লাগবে? রাজউক যখন বরাদ্দ দেয়, তিনি আবেদন করে সেই প্লট বুঝে নেন। চাইলে তিনি বরাদ্দ না নিলেও পারতেন। সেখানে একজন সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ বরাদ্দ পেতে পারতেন। এরপরও জনগণের সম্পদ থেকে লোভ সামলাতে পারেননি।’

 আরও পড়ুন       শীতে হাত কোমল রাখবেন যেভাবে 

পর্যবেক্ষণে বিচারক আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছেন। রাজউক বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা যদি আইন না মানে, তাহলে কে মানবে? তারা সংঘবদ্ধভাবে নিয়ম ভঙ্গ করেছে, তদারকি না করে।’ দেশের সর্বত্র প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে বিচারক বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরে দুর্নীতি কমাতে হুইসেল-ব্লোয়িং সিস্টেম থাকতে হবে। ভেতরে যারা দুর্নীতি দেখবে, তারা যেন বাইরে জানাতে পারে। তাদের শাস্তি না দিয়ে পুরস্কৃত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ হলেন এমন একজন ব্যক্তি, সাধারণত একজন কর্মচারী, যিনি নিজের সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ভেতরের অন্যায়, অবৈধ, অনৈতিক, বেআইনি, অনিরাপদ বা প্রতারণামূলক কাজ সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেন।

বিচারক আরও উল্লেখ করেন, ‘২০২২ সালের ৩ আগস্ট শেখ হাসিনা প্লট পেয়েছেন। এর এক মাস না পেরোতে ৩১ আগস্ট ছেলের জন্য সুপারিশ করেন। পরের মাসে ১১ সেপ্টেম্বর মেয়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়। নিজের ছেলে-মেয়ে, বোন, বোনের ছেলে-মেয়ে সবাইকে সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা কী আশা করি রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে?’

এ সময় আদালতে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বিচারক বলেন, ‘আপনাদের জন্যই এ দেশে অভ্যুত্থান হয়েছে। প্লট দুর্নীতির এসব অনিয়ম আপনাদের মাধ্যমেই সামনে এসেছে। মিডিয়া যে চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে– আমরা এ মামলার মাধ্যমে দেখলাম। এটি আপনাদের জন্যও শিক্ষা। আপনাদের প্রতিবেদন না থাকলে দুদক এ মামলা করত না।’

কার কী সাজা

তিন মামলায় ২১ বছর সাজার পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে এক লাখ টাকা করে তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে তাঁকে ছয় মাস করে ১৮ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে পাঁচ বছর দণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে এক মামলায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাঁকে আরও ছয় মাসের কারাভোগ করতে হবে। তবে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকারকে খালাস দেওয়া হয়েছে।তিন মামলায় সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শরীফ আহমেদসহ তিনজনকে ১৮ বছর করে কারাদণ্ড এবং তিন লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য দুই আসামি হলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. শহীদুল্লা খন্দকার এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াসি উদ্দিন।এ ছাড়া রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আনিছুর রহমান মিয়াকে তিন মামলায় ১৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে দুই মামলায় ১২ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজউকের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ও মেজর (অব.) শামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরীকে তিন মামলায় ৯ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার ও সাবেক সদস্য মোহাম্মদ খুরশিদ আলমকে তিন মামলায় তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজউকের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ও তন্ময় দাসকে দুই মামলায় তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজউকের সাবেক সদস্য কবির আল আসাদের এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজউকের সাবেক পরিচালক শেখ শাহিনুল ইসলামের এক মামলায় তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক সহকারী পরিচালক কামরুল ইসলামকে এক মামলায় তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সাবেক উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের এক মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক সহকারী পরিচালক নায়েব আলী শরীফকে দুই মামলায় এক বছর করে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক উপপরিচালক হাবিবুর রহমান সবুজকে এক মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সাবেক সহকারী পরিচালক মাজহারুল ইসলামকে এক মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালতের পরিবেশ

এদিন গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি রাজউকের সাবেক সদস্য খুরশীদ আলমকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। রায় ঘোষণার আগে ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে পাঁচতলায় এজলাসে তোলা হয়। ১১টা ২৩ মিনিটে বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন এজলাসে আসেন। প্রথমে শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের মামলার রায় পড়া শুরু হয়। পরে একে একে তিন মামলার রায় দেন বিচারক। ১২টা ৫ মিনিটে এজলাস থেকে নেমে যান বিচারক।

রায়ের পর দুদকের সামনে ককটেল

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ের সামনে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।ঢাকার রমনা থানার ওসি গোলাম ফারুক বলেন, দুদকের বিপরীত পাশে মোটরসাইকেলে এসে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর পাশে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের বাসা রয়েছে। ওই ঘটনায় অপরাধীদের শনাক্তে কাজ চলছে।

ঢাকাভয়েস/এ

No comments

Powered by Blogger.