শহীদ জিয়ার সদা-প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক আদর্শ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুইজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাদের কর্মকাণ্ড, মতাদর্শ ও কৌশলের জন্য আলোচিত ও সমালোচিত। রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল ভিত্তি তৈরি করেছেন এই দু’জন- শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান। তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, এবং ভূ-রাজনীতিতে গভীর ও স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছেন। সমর্থকদের কাছে তারা যথাক্রমে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘শহীদ জিয়া’ নামে স্মরিত।
শেখ মুজিবুর রহমান মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের শীর্ষস্থানীয় নেতা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি দেশ পরিচালনা করেছেন। তার মূল আদর্শ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র। তার পুরো রাজনৈতিক সংগ্রাম গণতন্ত্রের জন্য হলেও সেই তিনিই দেশ স্বাধীনের তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বাকশাল’ গঠন করে সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রহিত করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে তার ভূমিকা প্রশংসনীয় হলেও দেশে সুশাসন কায়েমে তার ব্যর্থতা অধিকতর সমালোচিত হয়। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ এদেশের মানুষের এখনো দগদগে স্মৃতি। অপরিকল্পিত উপায়ে ঢালাও জাতীয়করণের নীতি এদেশের শিল্প ও বেসরকারি খাত বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুজিব সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর দৃশ্যপটে নতুন করে আসেন জিয়াউর রহমান। তিনি আগে থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক ও অন্যতম সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দেশবাসীর কাছে সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি হন। বাকশালের বিপরীতে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজনৈতিক আদর্শ ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি।
জিয়াউর রহমানের স্বল্পকালীন শাসনামলে দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। তিনি খাল খনন কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনেন। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং পাল্টাপাল্টি সেনা অভ্যুত্থানে বিধ্বস্ত বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য। বেসরকারিকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স, গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সার্কের মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ছোট ছোট দেশগুলো নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্য সমতা ও মর্যাদার সম্পর্ক নির্মাণে তার উদ্যোগ ছিল অসামান্য। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।
বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমানের দর্শন ও আদর্শে প্রভাবান্বিত। নানা আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও এই দুই নেতার জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে তাদের প্রয়াণের পরও। এই দুই নেতাকে সামনে রেখেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে। এদেশের রাজনীতি এখনো মূলত এই দুই নেতার আদর্শ ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই আবর্তিত হয়।
এর মধ্যে শহীদ জিয়ার প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উদারীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের রাজনীতির মূলধারা। যতবার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, অধিকাংশ সময় বাংলাদেশের মানুষ শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিই সম্মান জানিয়েছে। রাজনৈতিক পরিক্রমায় শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকেই এদেশের মানুষ বার বার বেছে নিয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতিতে শহীদ জিয়ার রাজনীতি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। গত ছয় দশকের ইতিহসের বিভিন্ন সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্তে তাকে দেখা গেছে জাতির জন্য দিকনির্দেশক হয়ে উঠতে। একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর জাতি যখন দিশেহারা, তখন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে এসেছিল সেই কণ্ঠস্বর ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর জাতি যখন দিশেহারা, সেনাবাহিনীর মধ্যে অনৈক্যের রক্তাক্ত খেলা, তখনও ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন শহীদ জিয়া। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতি যখন আরেকবার অনিশ্চয়তায় ভুগছিল, তখনও শহীদ জিয়ার আদর্শের রাজনৈতিক দল বিএনপি মানুষের ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দেশকে নির্বাচনমুখী করতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মব সন্ত্রাস ও নানা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটিয়েছে।
আজ, শহীদ রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধা। তার রাজনৈতিক আদর্শ আগামী দিনের বাংলাদেশেও দিবালোকের মতই দীপ্যমান, উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।


No comments