Adsterra

লোড হচ্ছে...

জঙ্গল সলিমপুর || নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি

জঙ্গল সলিমপুর, নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News

খুন, হামলা, পাল্টা হামলার পর দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায় ৯ মার্চ বিভিন্ন বাহিনীর তিন হাজারের বেশি সদস্যের অংশগ্রহণে একটি বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল প্রশাসন। ‘মুক্ত’ সলিমপুরে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন দেয় পুলিশের তিন সদস্যের একটি কমিটি। ৯ এপ্রিলে দেওয়া সেই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সলিমপুরের নিরাপত্তা টেকসই ও জোরদার করতে কয়েকটি প্রস্তাব করা হয়েছিল সেখানে।

চট্টগ্রামের বায়েজিদ লিংক রোড থেকে জঙ্গল সলিমপুরে ঢোকার মূল প্রবেশ পথে চেকপোস্ট বসানোর কথা বলা হয়। এছাড়া জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা থেকে আলীনগর যাওয়ার পথে আরেকটি চেকপোস্ট প্রয়োজনীয়তার বিষয়ও সেখানে ছিল; যাতে বাইরে থেকে কেউ জঙ্গল সলিমপুরে ঢোকার চেষ্টা করলে চেকপোস্টে তল্লাশির মুখোমুখি হন। দীর্ঘ দিনেও এসব চেকপোস্ট বসানো হয়নি। এমনকি সলিমপুরে নজরদারি কার্যক্রমের গতি বাড়াতে প্রায় সোয়া ৬ কিলোমিটারের তিনটি সংযোগ সড়ক পাকা করার প্রস্তাব থাকলেও চিঠি চালাচালির মধ্যে সেটি এখনও সীমাবদ্ধ। মুক্ত সলিমপুরের নিরাপত্তায় বেশ কিছু ত্রুটি চিহ্নিত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে আবার জঙ্গল সলিমপুরে আবার হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। 

সর্বশেষ রোববার দিবাগত রাত ১টার পর বায়েজিদ লিঙ্ক রোড থেকে যাওয়ার পথে জঙ্গল ছলিমপুরের খেজুরতলা, পাথরিঘোনা ও আলীনগর চৌরাস্তা মোড় এলাকায় চারটি স্থানে এক্সক্যাভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে ফেলে সন্ত্রাসীরা। আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে পুলিশের নির্মাণাধীন একটি ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। 

দীর্ঘ চেষ্টার পর প্রশাসন গত ৯ মার্চ একটি বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিলেও সেখানকার নিরাপত্তার ত্রুটির বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ মহাপরিদর্শকের জঙ্গল সলিমপুর যাওয়ার কথা রয়েছে। তার আগেই সেখানে সন্ত্রাসীদের আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটল। এরপর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সোমবার রাতে পরবর্তী করণীয় নিয়ে চট্টগ্রামে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সরেজমিনে পরিদর্শনের পর সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এপ্রিলে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়েজিদ লিংক রোড থেকে জঙ্গল সলিমপুরে যাওয়ার মূল প্রবেশপথ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের আওতাধীন। সেখানে চেকপোস্ট কার্যক্রম চালু করা গেলে অবৈধ অস্ত্রধারীদের প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এছাড়া জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে জঙ্গল ও পাহাড় বেশি। সেখানে অপরাধীদের পালিয়ে থাকা সুবিধাজনক। এমনকি জনবসতিও সেই এলাকায় অপেক্ষাকৃত কম। এক সময় আলীনগর সন্ত্রাসীদের মূল ‘ঘাঁটি’ ছিল। আলীনগরের খেজুরবাগান এলাকায় চেকপোস্ট বসানো গেলে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব।

জঙ্গল সলিমপুরের আভিযানিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে দুটি ক্যাম্পে আড়াইশর মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আছে। এর মধ্যে এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় (ছিন্নমূল) ক্যাম্প-১ এবং আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয় ক্যাম্প-২। এছাড়া দুটি ক্যাম্পের নিরাপত্তায় কী কী বিষয় প্রয়োজন তার বিস্তারিত সেই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। 

অভিযান-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবিত দুটি চেকপোস্টে তিন দফায় পালাক্রমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত রাখা গেলে বড় ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত মার্চে সলিমপুর মুক্ত করার পর সেখানকার আভিযানিক গতি বাড়াতে রাস্তা পাকা করার বিষয়টি সামনে আসে। অভিযানের সঙ্গে জড়িতরা এর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেন। প্রয়োজনে দ্রুত কাঁচা সড়কে ইট বসিয়ে অভিযানের অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, জঙ্গল সলিমপুরে কোনো অভিযান চালাতে গেলে নারী ও শিশুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত সন্ত্রাসীরা। ২০২২ সালের জুলাই মাসে সেখানকার খাস পরিদর্শনে জেলা প্রশাসন সেখানে অভিযানে গেলে গাড়িবহরে হামলা করা হয়। 

প্রশাসনের প্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে বড় বড় গর্ত করা হয়। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি র্যা ব জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে যাওয়ার পর আক্রান্ত হয়। এতে র্যা ব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন নিহত হন। জঙ্গল সলিমপুরের যোগাযোগ অবকাঠামো না থাকা ও দুর্গম হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুটি ক্যাম্পে খাবার, পানি, রসদ ও সরঞ্জামাদি নির্বিঘ্নে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি কার্যক্রমের গতি আনতে সোয়া ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তিনটি রাস্তা পাকা করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয় সেখানে। এই বাবদ ১৬ কোটি টাকা চেয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন বিগ্রেডকে দিয়ে তিনটি সড়ক পাঁকা করতে চায় তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাব অনুযায়ী পাকা সড়ক তৈরি হলে রোববার রাতে এত সহজে সন্ত্রাসীদের পক্ষে রাস্তা কেটে ফেলা সম্ভব হতো না। 

দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের নিরাপদ ‘অভয়ারণ্য’, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং অপরাধী চক্রের পাল্টা হামলার কারণে বারবার আলোচনায় এসেছে জঙ্গল সলিমপুরের নাম। এটি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। কয়েক দশক একাধিক সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু গ্রুপ সেখানে সক্রিয়। জঙ্গল সলিমপুর যেন বাংলাদেশের ভেতর আরেক বাংলাদেশ। পাহাড় কেটে অবৈধভাবে প্লট তৈরি, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলে সেখানে। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বেচাকেনা এবং চোরাচালান রমরমা। 

এদিকে সর্বশেষ পুলিশ সপ্তাহে অনুষ্ঠানে জঙ্গল সলিমপুরের বিষয়টি উত্থাপিত হয়। সেখানে পুলিশ একাডেমি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

No comments

Powered by Blogger.