মোসাদ্দেক থেকে খামেনি: ইরানে সিআইএর যত অভিযান
প্রায় সাত দশক আগে ফেরা যাক। ইরানে তখন শাহ রাজবংশের শাসন। তৎকালীন মার্কিন গুপ্তচররাই এই শাসন টিকিয়ে রাখতে অন্যতম ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ বংশের পতন হয়। বিপ্লব পরবর্তী ইরানিরা হয়ে ওঠে ঘোর মার্কিনবিরোধী।রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে ইরানিদের মার্কিনবিরোধী অবস্থান শক্ত হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ইরানে গোপনে, কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্রম চালিয়েছে। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে তাদের প্রথম সরাসরি ভূমিকার কথা সামনে আসে প্রায় সাত দশক আগে- ১৯৫৩ সালে। গল্পটা সেখান থেকেই শুরু করা যাক।
তেল, মোসাদ্দেক, সিআইএ
মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানের প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৫১ সালে। তিনি ব্রিটিশ মালিকানাধীন অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কোম্পানিটি বিপুল মুনাফা করলেও ইরানকে দিত মাত্র ১৬ শতাংশ। অনেক সময় এরও কম। ক্ষমতায় এসে তেল শিল্প জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার পরই ব্রিটিশ সরকার মোসাদ্দেককে ক্ষমতা থেকে সরানোর পরিকল্পনা শুরু করে।অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিপ্লোম্যাটিক স্টাডিজ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের অক্টোবরে মোসাদ্দেক ব্রিটেনকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এককভাবে ওই সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়ে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চায়। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ নীতির বিরোধিতা করে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন অ্যাচেসন বলেছিলেন, ব্রিটেন ইরানে ‘শাসন অথবা ধ্বংস’ এই নীতি অনুসরণ করছে।১৯৫২ সালে ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এবার মোসাদ্দেককে উৎখাতের জন্য ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের আহ্বানে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক সাড়া দেয়। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একসঙ্গে মোসাদ্দেককে অপসারণে কাজ করতে সম্মত হয়।মোসাদ্দেককে হটানোর পরিকল্পনার নাম ছিল ‘অপারেশন আজাক্স’। মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের রাজবংশের শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে দিয়ে মোসাদ্দেককে বরখাস্তের ফরমান জারি করানো। তবে রেজা পাহলভি এমন অজনপ্রিয় ও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। দীর্ঘ বোঝাপড়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ঘুষের কাছে নতি স্বীকারের পর শেষ পর্যন্ত কাজ হয়। আগস্টের শুরুতে ইরানে সিআইএর সহযোগী এজেন্টরা মুসলিম নেতাদের হুমকি দেয়। মোসাদ্দেক ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করছেন– এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়।১৯৫৩ সালের ১৬ আগস্ট রেজা পাহলভি আনুষ্ঠানিকভাবে মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করেন এবং সিআইএর পছন্দের প্রার্থী জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। এই ফরমানগুলোর ভাষ্য নির্ধারণ করেছিলেন পরিকল্পনার নীলনকশাকারী ও সিআইএ কর্মকর্তা ডোনাল্ড উইলবার। অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সংঘটিত বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থান ঘটায়। মোসাদ্দেককে তিন বছরের জন্য কারাবন্দি করা হয়। ১৯৬৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি গৃহবন্দি ছিলেন।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও অপারেশন মার্লিন
১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া ‘অপারেশন মার্লিন’ ছিল সিআইএর কাউন্টার-প্রলিফারেশন ডিভিশনের অত্যন্ত গোপনীয় প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য ছিল ত্রুটিপূর্ণ নকশা সরবরাহের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া। সিআইএর লক্ষ্য ছিল ইরানি প্রকৌশলীদের এমন একটি যন্ত্রের পেছনে বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করা, যা কখনোই কাজ করবে না।মিডল ইস্ট আইয়ের ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানের জন্য সিআইএ ‘মার্লিন’ ছদ্মনামের এক রুশ অভিবাসী বিজ্ঞানীকে নিয়োগ দেয়। যার কাজ ছিল নকশাগুলো পৌঁছে দেওয়া। তবে শুরু থেকেই ওই অভিযানে নানা অব্যবস্থাপনা ছিল। মার্লিন এক সময় লক্ষ্য করেন, নকশায় কিছু জরুরি অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে এবং যন্ত্রাংশের তালিকাটি রুশ ভাষার বদলে ইংরেজিতে লেখা। মার্লিন তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানিরা সহজেই এই ভুলগুলো ধরে ফেলবে। কিন্তু সিআইএর কর্মকর্তারা মার্লিনকে সেসব ত্রুটি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।২০০০ সালের মার্চ মাসে মার্লিন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় যান নকশাটি হস্তান্তর করতে। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থায় (আইএইএ) অবস্থিত ইরান মিশনের একটি মেইল স্লটে (চিঠি ফেলার বাক্স) নকশাগুলো ফেলে আসেন। সিআইএ পরে ওই অভিযানকে সফল বলে ঘোষণা করে। কারণ, তাদের ধারণা ছিল নকশাটি ইরানে পাঠানো হয়েছে। ২০০৩ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্পটি চলে। পরে সেটিকে একটি ‘অর্থহীন’ প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সাবেক কর্মকর্তা জেফরি স্টার্লিংয়ের বিচারের সময় অভিযানটির তথ্য সামনে আসে।
দ্য গার্ডিয়ান ও সিকিউরিটি অ্যান্ড ডিফেন্স কোয়ার্টারলির তথ্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে সিআইএর অন্য অভিযানের মধ্যে ছিল অলিম্পিক গেমস ও স্টাক্স-নেট।
শাসনব্যবস্থা ও খামেনিকে হত্যা
দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে হত্যার জন্য সিআইএ ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। গত রোববার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, সিআইএ কয়েক মাস ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির ওপর নজর রাখছিল। তাঁর অবস্থান ও চলাচলের ধরন সম্পর্কেও তথ্য ছিল। এরপর সংস্থাটি জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে একটি সরকারি কম্পাউন্ডে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হতে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি ছিল- ওই বৈঠকে খামেনিও উপস্থিত থাকবেন।
নতুন এই গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলার সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, সিআইএ আয়াতুল্লাহ খামেনির অবস্থান সম্পর্কে ‘হাই ফিডেলিটি’ বা অত্যন্ত নির্ভুল তথ্য দিয়েছিল ইসরায়েলকে। গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘাতের পর থেকেই মূলত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওপর গোয়েন্দা নজরদারি জোরালো করে। একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, শনিবারের অভিযানে সেই একই নেটওয়ার্কের (তথ্য প্রাপ্তির) ওপর নির্ভর করা হয়।
আরও পড়ুন পরাজয় অথবা আরও আক্রমণের দোটানায় পড়েছেন ট্রাম্প
ঢাকাভয়েস/এই

No comments