তেল ও খনিজ সম্পদের মহাসমুদ্র; আমেরিকার টার্গেটে কেন ভেনেজুয়েলা?
দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরে অবস্থিত এক দেশ ভেনেজুয়েলা। একদিকে বিশ্বের অন্যতম বড় তেলের মজুদ, অন্যদিকে গিনেস রেকর্ডে নাম লেখানো রহস্যময় বজ্রপাত—সব মিলিয়ে দেশটি যেন এক বিস্ময়কর ভূখণ্ড। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ছাপিয়ে আজও ভেনেজুয়েলা বিশ্ববাসীর কাছে এক কৌতূহলের নাম।
ভেনেজুয়েলা শুধু তেলের জন্য নয়, বরং এর নামের পেছনের ইতিহাস এবং বন্যপ্রাণের বৈচিত্র্যের জন্যও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই ভূখণ্ডের প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চকর সব তথ্য।
নামের উৎপত্তি: ‘লিটল ভেনিস’ বা ছোট্ট ভেনিস
ভেনেজুয়েলা নামের উৎপত্তি বেশ মজার। ১৪৯৯ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী আলোনসো ডি ওজেদা এবং আমেরিগো ভেসপুচি যখন এই অঞ্চলে পৌঁছান, তখন তারা দেখেন স্থানীয় আদিবাসীরা মারাকাইবো লেকের ওপর খুঁটি গেড়ে ঘর তৈরি করে বসবাস করছে। পানির ওপর এই বসতি দেখে তাদের ইতালির বিখ্যাত শহর ভেনিসের কথা মনে পড়ে যায়। সেই থেকেই তারা এই অঞ্চলের নাম দেন ‘ভেনেজুয়েলা’, যার স্প্যানিশ অর্থ হলো ‘লিটল ভেনিস’ (Little Venice) বা ছোট্ট ভেনিস।
ধর্মাবলম্বী ও বিশ্বাস
ভেনেজুয়েলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
ক্যাথলিক খ্রিস্টান : দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৭১% থেকে ৯৬% মানুষ রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান। প্রতিটি শহরেই সুন্দর কারুকার্যময় প্রাচীন গির্জা দেখা যায়।
প্রোটেস্ট্যান্ট ও অন্যান্য: প্রায় ১৫% থেকে ২০% মানুষ প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদে বিশ্বাসী।
লোকজ বিশ্বাস: মূল ধর্মের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় ‘মারিয়া লায়ঞ্জা’ (Maria Lionza) নামক এক ধরণের লোকজ ও আধ্যাত্মিক ধর্মের প্রচলন রয়েছে, যা আদিবাসী, আফ্রিকান এবং ক্যাথলিক বিশ্বাসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
আকাশছোঁয়া জলপ্রপাত: পৃথিবীর সর্বোচ্চ ‘অ্যাঞ্জেল ফলস’
ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো অ্যাঞ্জেল ফলস। ৯৭৯ মিটার উচ্চতার এই জলপ্রপাতটি নায়াগ্রা জলপ্রপাতের চেয়েও ১৫ গুণ বেশি উঁচু। কানাইমা ন্যাশনাল পার্কের (Canaima National Park) গহিন জঙ্গলে অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত। মেঘের রাজ্য থেকে নেমে আসা পানির ধারা পর্যটকদের কাছে পৃথিবীর এক টুকরো স্বর্গ হিসেবে পরিচিত।
তেলের খনি ও ভূ-গর্ভস্থ সম্পদ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ নিয়ে বসে আছে ভেনেজুয়েলা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে পেছনে ফেলে এখানকার মাটির নিচে রয়েছে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল (Crude Oil)। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এই বিশাল সম্পদ দেশটির জন্য এখন অনেকটা ‘অভিশাপ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুদ্রা যখন খেলনা
ভেনেজুয়েলার মুদ্রাস্ফীতি এতটাই ভয়াবহ যে, দেশটির মুদ্রা ‘বলিভার’-এর মান কাগজের চেয়েও কমে গেছে। অনেক স্থানীয় মানুষ এখন অকেজো নোট দিয়ে ব্যাগ, মানিব্যাগ বা ঘর সাজানোর শো-পিস তৈরি করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করেন। ডলারের বিপরীতে বলিভারের মান প্রতিনিয়ত কমতে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কেনাকাটায় ‘বার্টার সিস্টেম’ বা পণ্য বিনিময় প্রথা ফিরে এসেছে।
প্রিয় খাবার ‘আরেপা’
ভেনেজুয়েলার মানুষের সকালের নাস্তা থেকে রাতের খাবার—সবখানেই আছে ‘আরেপা’। এটি মূলত ভুট্টার আটা দিয়ে তৈরি এক ধরনের গোল রুটি বা কেক, যার ভেতরে মাংস, পনির বা অ্যাভোকাডো ভরা থাকে। এটি ভেনেজুয়েলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পৃথিবীর একমাত্র ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’
ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো লেকের মোহনায় ঘটে বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাকৃতিক ঘটনা। বছরে গড়ে ২৬০ দিন এবং প্রতি রাতে ১০ ঘণ্টা ধরে এখানে একটানা বজ্রপাত হতে থাকে। একে বলা হয় ‘ক্যাটাতুম্বো লাইটনিং’ (Catatumbo Lightning)। মারাকাইবো লেকের যেখানে ক্যাটাতুম্বো নদী মিশেছে, সেখানে কোনো মেঘের ডাক ছাড়াই বিদ্যুৎ চমকায়। প্রাচীনকালে নাবিকরা এই আলো দেখে সমুদ্রপথে দিক নির্ণয় করতেন। প্রতি বছর এখানে প্রায় ১২ লক্ষ বার বজ্রপাত হয়, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর রক্ষায় ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি পৃথিবীর প্রাকৃতিক ওজোন জেনারেটর হিসেবে পরিচিত। এই দৃশ্য দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার গবেষক ও পর্যটক ভিড় করেন।
বেসবল যখন জাতীয় আবেগ
পুরো লাতিন আমেরিকা যেখানে ফুটবলের জন্য পাগল, সেখানে ভেনেজুয়েলা ব্যতিক্রম। এখানকার প্রধান এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো বেসবল (Baseball)। আমেরিকার মেজর লিগ বেসবলে (MLB) ভেনেজুয়েলার অনেক খেলোয়াড় অত্যন্ত সুনামের সাথে খেলছেন।
সমতল মাথার পাহাড়: ‘টেপুইস’
দেশটির আমাজন সীমান্তে রয়েছে অদ্ভুত সব পাহাড়, যেগুলোর চূড়া একদম টেবিলের মতো সমতল। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘টেপুইস’। এর মধ্যে মাউন্ট রোরারিমা (Mount Roraima) সবচেয়ে বিখ্যাত। বিজ্ঞানীদের মতে, এগুলো পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর একটি, যেখানে এমন অনেক উদ্ভিদ পাওয়া যায় যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই।
সুন্দরীদের মুকুট
ভেনেজুয়েলা মানেই বিশ্বমঞ্চে সুন্দরীদের জয়জয়কার। ৭টি মিস ইউনিভার্স এবং ৬টি মিস ওয়ার্ল্ড শিরোপা জিতে দেশটি ‘সুন্দরীদের কারখানা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
অদ্ভুত সব দ্বীপপুঞ্জ: লস রোকস
ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থিত ভেনেজুয়েলার লস রোকস দ্বীপপুঞ্জ পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর প্রবাল প্রাচীর। এখানে প্রায় ৩৫০টি ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। স্ফটিক স্বচ্ছ নীল পানি আর সাদা বালুর এই সৈকতগুলো বিশ্বের ধনী পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।
বিচিত্র প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম ‘মেগাডাইভার্স’ দেশ হিসেবে স্বীকৃত। এখানে এমন সব প্রাণী দেখা যায় যা পৃথিবীর অন্য কোথাও মেলা ভার:
ক্যাপিবারা : ভেনেজুয়েলায় একে ‘চিগুইরে’ বলা হয়। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ইঁদুর জাতীয় প্রাণী। এরা সাধারণত জলাশয়ের আশেপাশে দলবদ্ধভাবে বাস করে।
জায়ান্ট অ্যানাকোন্ডা : বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাপ অ্যানাকোন্ডার প্রধান আবাসস্থল হলো ভেনেজুয়েলার লানোস জলাভূমি।
অরিনোকো কুমির : এটি বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন প্রজাতির কুমির, যা কেবল ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার অরিনোকো অববাহিকায় পাওয়া যায়।
হার্পি ঈগল : পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শিকারি পাখিদের মধ্যে এটি অন্যতম, যা ভেনেজুয়েলার গহিন জঙ্গলে দেখা যায়।
লাল হাওলার মাঙ্কি : এদের চিৎকারের আওয়াজ কয়েক মাইল দূর থেকেও শোনা যায়।
ভেনেজুয়েলা: তেলের মহাসমুদ্রে বাস করেও কেন এই হাহাকার?
ভেনেজুয়েলা, দক্ষিণ আমেরিকার এমন এক দেশ, যা একসময় ছিল মহাদেশটির সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম এই দেশ। তারপরও ভেনেজুয়েলা আজ ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। দেশটি নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষের যেন আগ্রহের শেষ নেই।
অর্থনৈতিক ধস ও মুদ্রাস্ফীতি
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ হলো খনিজ তেল। কিন্তু তেলের দাম কমে যাওয়া এবং ভুল অর্থনৈতিক নীতির কারণে দেশটিতে হাইপার-ইনফ্লেশন দেখা দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এক কেজি চাল বা রুটি কিনতে মানুষকে বস্তা ভরে টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হয়। দেশটির মুদ্রার নাম ‘বলিভার’, যার মান বর্তমানে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মাদুরো শাসন
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং বিরোধী দলের মধ্যে দীর্ঘদিনের লড়াই দেশটিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আমেরিকা সহ পশ্চিমা দেশগুলো ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এটি দেশটির তেল রপ্তানিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
মানবিক সংকট ও অভিবাসন
খাদ্য ও ওষুধের তীব্র অভাবের কারণে গত কয়েক বছরে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। একে বলা হচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসের বৃহত্তম অভিবাসন সংকট। সাধারণ মানুষ কলম্বিয়া, ব্রাজিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে পাড়ি জমাচ্ছে একটু উন্নত জীবনের আশায়।
মাটির নিচে সম্পদের পাহাড়: ভেনেজুয়েলার প্রধান খনিজ সম্পদসমূহ
ভেনেজুয়েলা প্রাকৃতিক সম্পদে এতটাই ধনী যে, একে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু মনে করা হয়। দেশটির প্রধান খনিজ সম্পদগুলো হলো:
১. অপরিশোধিত তেল : ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো তেল। দেশটির ওরিনোকো বেল্ট অঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ রয়েছে। সৌদি আরবের চেয়েও বেশি তেল এখানে সঞ্চিত আছে। তবে এখানকার তেল সাধারণত 'হেভি ক্রুড' বা ঘন প্রকৃতির, যা পরিশোধন করা কিছুটা ব্যয়বহুল।
২. সোনা : ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ মজুদের দেশ। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ‘আরকো মিনেরো’ নামক একটি বিশাল খনি অঞ্চল রয়েছে। সেখানে মাটির নিচে হাজার হাজার টন সোনা জমা হয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ খনির কারণে এই সম্পদ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কও রয়েছে।
৩. প্রাকৃতিক গ্যাস : তেলের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়। বিশ্বের শীর্ষ দশটি প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ দেশের তালিকায় ভেনেজুয়েলার নাম রয়েছে। সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে এই গ্যাসের বড় বড় মজুদ রয়েছে।
৪. হীরা : ভেনেজুয়েলার গুয়ায়ানা অঞ্চলে প্রচুর হীরা পাওয়া যায়। এখানকার হীরা উন্নতমানের এবং বিশ্ববাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সোনা এবং হীরা দেশটির খনিজ আয়ের বড় একটি উৎস।
৫. লোহা এবং বক্সাইট : ইস্পাত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় লোহা বা আয়রন ওর-এর বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে এখানে। এছাড়া অ্যালুমিনিয়াম তৈরির প্রধান উপাদান বক্সাইট উত্তোলনেও ভেনেজুয়েলা বেশ এগিয়ে। দেশটির সিউদাদ গুয়ায়ানা অঞ্চলটি খনিজ প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের কেন্দ্র।
৬. কোল্টান : আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অতি প্রয়োজনীয় খনিজ হলো কোল্টান, যা স্মার্টফোন এবং ল্যাপটপের ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভেনেজুয়েলায় এই ‘ব্লু গোল্ড’ বা নীল সোনার বড় মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার বিউটি একাডেমিগুলোর ভেতরকার রুদ্ধশ্বাস গল্প
ভেনেজুয়েলা—নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশ্বমঞ্চে মুকুট জয়ী কোনো এক সুন্দরীর হাসিমুখ। কিন্তু এই মুকুটের পেছনের গল্পটি মোটেও রূপকথার মতো সহজ নয়। দেশটিতে সুন্দরী হওয়া কেবল একটি শখ নয়, বরং এটি একটি জাতীয় শিল্প। আর এই শিল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ভেনেজুয়েলার বিউটি একাডেমিগুলো (Beauty Academies), যেগুলোকে বিশ্বজুড়ে ‘সুন্দরী তৈরির কারখানা’ (Factory of Beauty Queens) বলা হয়।
সৌন্দর্য একাডেমি : দেশটিতে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের জন্য বিশেষ গ্রুমিং স্কুল রয়েছে, যেখানে হাঁটা, কথা বলা এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব : ভেনেজুয়েলায় রূপচর্চা এবং সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাকে একটি লাভজনক ক্যারিয়ার এবং জাতীয় সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
কসমেটিক সার্জারি : দেশটিতে প্লাস্টিক সার্জারি সামাজিক ভাবে খুবই গ্রহণযোগ্য, যা প্রতিযোগীদের নিখুঁত লুক পেতে সাহায্য করে।
ব্যাগ ভর্তি টাকা বনাম একটি ডলার: ভেনেজুয়েলার ‘ডলারাইজেশন’ ও টিকে থাকার লড়াই
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের এমন এক দেশ যেখানে আপনি যদি এক কাপ কফি কিনতে চান, তবে হয়তো আপনাকে এক বস্তা টাকা নিয়ে দোকানে যেতে হবে। দেশটির নিজস্ব মুদ্রা ‘বলিভার’ (Bolivar) তার মান এতটাই হারিয়েছে যে, বর্তমানে সাধারণ মানুষ টিকে থাকার জন্য মার্কিন ডলারকে (US Dollar) তাদের প্রধান মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব বা ‘ডলারাইজেশন’-এর গল্পটি যেমন ট্র্যাজিক, তেমনি কৌতূহল উদ্দীপক।
মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহতা : ভেনেজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতির হার এক সময় কয়েক লক্ষ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব কাটেনি। পরিস্থিতি এমন যে, সকালে একটি সাবানের দাম যা থাকে, বিকেলের মধ্যে তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কাগজের মুদ্রার মান এতোটাই কমেছে যে, রাস্তাঘাটে এখন অকেজো বলিভার নোট পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা কেউ কুড়িয়েও নেয় না।
ডলার কেন ‘ত্রাতা’ হয়ে এলো?
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ডলার ব্যবহারের অনুমতি না দিলেও ২০১৯ সাল থেকে সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে ডলার ব্যবহার শুরু করে। ছোট মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় শপিং মল—সবখানে এখন দাম নির্ধারণ করা হয় ডলারে। মানুষ এখন আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বলিভার রাখতে চায় না; তাদের কাছে একটি ৫ বা ১০ ডলারের নোট মানেই দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা।
ভেনেজুয়েলায় এখন দুটি সমান্তরাল অর্থনীতি চলছে:
ডলার অর্থনীতি: যারা প্রবাসীদের কাছ থেকে ডলার পায় বা অনলাইনে কাজ করে, তারা কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছে।
বলিভার অর্থনীতি: সরকারি চাকরিজীবী বা বয়স্ক যারা পেনশনের বলিভারের ওপর নির্ভরশীল, তারা ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। কারণ তাদের সার মাসের আয় দিয়ে বড়জোর কয়েক কেজি চাল কেনা সম্ভব।
ডিজিটাল ওয়ালেট ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার
নগদ ডলারের সংকটের কারণে মানুষ এখন ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করছে। এমনকি বাজারের সবজি বিক্রেতাও এখন কিউআর কোডের মাধ্যমে পেমেন্ট নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কাগজের মুদ্রার দিন যেন ভেনেজুয়েলায় ফুরিয়ে এসেছে।
সরকারের অবস্থান: ইউ-টার্ন
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো একসময় ডলারকে ‘শয়তানের মুদ্রা’ বলতেন। কিন্তু অর্থনীতির ধস ঠেকাতে এখন তিনিও বলছেন—"ডলার ব্যবহার করলে যদি দেশের মঙ্গল হয়, তবে আমরা তা করতে পারি।" বর্তমানে দেশটির প্রায় ৮০% লেনদেন কোনো না কোনোভাবে মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবন এখন অনেকটা ‘সারভাইভাল গেম’-এর মতো। মুদ্রাস্ফীতি আর অভাবের মাঝে তারা কীভাবে দিন পার করছে, তার কিছু করুণ ও বাস্তব চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
১. ‘ডায়েট অব মাদুরো’: ক্ষুধার্ত এক জনপদ
ভেনেজুয়েলার মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত কৌতুক আছে— ‘মাদুরো ডায়েট’। চরম খাদ্য সংকটের কারণে দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ গড়ে ৮ থেকে ৯ কেজি ওজন হারিয়েছে। সাধারণ মানুষের এক মাসের ন্যূনতম বেতন দিয়ে বর্তমানে এক কেজি মাংস বা এক কার্টন ডিম কেনাও অসম্ভব। ফলে মানুষের খাবারের প্রধান উৎস এখন সস্তা শ্বেতসার জাতীয় খাবার বা অনেক ক্ষেত্রে আবর্জনার স্তূপ।
২. নোট দিয়ে তৈরি হস্তশিল্প
যেহেতু বলিভার নোটের কোনো ক্রয়ক্ষমতা নেই, তাই মানুষ এখন এই নোটগুলোকে কাগজ হিসেবে ব্যবহার করছে। কারাকাসের রাস্তায় আপনি দেখতে পাবেন অকেজো নোট দিয়ে তৈরি হ্যান্ডব্যাগ, টুপি বা খেলনা বিক্রি হচ্ছে। এক সময় যে টাকা দিয়ে বাড়ি কেনা যেত, এখন সেই টাকা দিয়ে একটি মানিব্যাগ তৈরি করে তা পর্যটকদের কাছে ডলারে বিক্রি করা হচ্ছে।
৩. বার্টার সিস্টেম বা পণ্য বিনিময়
টাকা যখন অর্থহীন, তখন মানুষ পুরনো যুগে ফিরে গেছে। গ্রামে বা ছোট শহরে এখন মাছের বিনিময়ে ওষুধ, বা আটার বিনিময়ে পনির নেওয়ার মতো ‘বার্টার সিস্টেম’ বা পণ্য বিনিময় প্রথা চালু হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ফিস হিসেবে ডিম বা মুরগিও গ্রহণ করছেন।
৪. সাত মিলিয়ন মানুষের দেশত্যাগ
জীবন বাঁচাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখের বেশি মানুষ ভেনেজুয়েলা ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়া, ব্রাজিল বা আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে। একে বলা হয় আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়। যারা দেশে রয়ে গেছেন, তারা মূলত প্রবাসে থাকা স্বজনদের পাঠানো ‘রেমিট্যান্স’ বা ডলারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।
৫. অন্ধকারে থাকা শহর
২০২৬ সালেও ভেনেজুয়েলার অনেক শহরে দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফ্রিজ না চলায় খাবার নষ্ট হয়ে যায়, পাম্প না চলায় পানির অভাব দেখা দেয়। আধুনিক এই যুগেও মানুষ এখন মোমবাতি আর লাকড়ির চুলায় রান্না করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
ভেনেজুয়েলা আমাদের শেখায় যে, কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই একটি দেশ সুখী হয় না, তার জন্য প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। এক সময়ের ‘ল্যাটিন আমেরিকার স্বর্গ’ আজ কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। তবে এত কষ্টের মাঝেও ভেনেজুয়েলার মানুষ তাদের গান, নাচ আর হাসিমুখে আগামীর স্বপ্ন দেখতে ভোলে না।
আরও পড়ুন ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য কি তবে ইরান?
ঢাকাভয়েস/এই

No comments