ক্ষমতার বাইরে থেকেও জনতার অন্তরে
কুয়াশায় মোড়া সকাল। তখনও আলো ঠিকমতো ফোটেনি। তবু রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে নেমেছে মানুষের ঢল। কেউ ধীরে হাঁটছেন, কেউ এক জায়গায় স্থির। কারও চোখের আঙিনায় জল, কারও হাতে তসবি আর মুখে প্রার্থনা– নীরব দীর্ঘশ্বাস। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা ঘিরে গতকাল বুধবার এমনই ছিল পরিবেশ। এই নগরে বহু জানাজা হয়েছে। বহু রাজনৈতিক নেতার বিদায়ও দেখেছেন ঢাকাবাসী। তবে গতকাল দিনটি ছিল আলাদা। কারণ সবাই জানে– এটি শুধু একজন নেত্রীর বিদায় নয়, এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষ চিত্র।
কদম ফেলছে সবাই, গন্তব্য একটাই– মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ হেঁটেই এগোচ্ছেন। সেই স্রোতে মিশে গেছেন ঢাকার বাইরে থেকে আসা আপসহীন নেত্রীর অগণন ভক্তরাও। কেউ শাহবাগ, কেউ মহাখালী, কেউ আবার গাবতলী থেকে হাঁটছেন। ঢাকার বাইরের মানুষ আসেন বাস, ট্রেন ও লঞ্চে চেপে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে আসাদগেট ধরে যতটা এগোনো যায়, মানুষের ঢল তত বাড়ে। মূল সড়কের দুই পাশে মানুষ, ফুট ওভারব্রিজে মানুষ, রাস্তার পাশের ভবনের ছাদে মানুষ। ঢাকা যেন একমুহূর্তে রূপ নেয় শোকযাত্রার নগরে। কারও মুখে নেই চেনা স্লোগান, নির্দেশনা দিয়ে কাউকেই সুশৃঙ্খল রাখার প্রয়োজন পড়ছে না। সবাই নেত্রী হারানোর ভাঙা হৃদয়ে যেন একই পথের পথিক। বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে শুরু হয় জানাজা। ৩টা ৫ মিনিটে শেষ। কিন্তু সেই দুই মিনিটে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ শুধু একটি সড়ক ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল জনসমুদ্র। বিজয় সরণি, খামারবাড়ি, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার– সব দিকের মানুষ মিশে গিয়েছিল এক রেখায়। চোখেমুখে ছিল একই অনুভূতি– একজন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিভাবককে হারানোর শোক। জানাজা শেষ হলেও মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে।
কেউ হাত তুলে দোয়া করেন, কেউ নীরবে তাকিয়ে থাকেন আকাশ পানে। যেন এ দুই মিনিটে বলা সব কথা এখনও শেষ হয়নি।জনসমুদ্রের সবাই বিএনপির নেতাকর্মী নন। অনেকেই রাজনীতির বাইরে থাকা সাধারণ মানুষ। উত্তরা থেকে হেঁটে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতেই কথা হয়। তিনি বললেন, ‘রাজনীতি করি না। তবে একজন নেত্রী দেশের মানুষের জন্য এত অত্যাচার সহ্য করেছেন– এটা মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর জানাজায় কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হলে সেটাকে কষ্ট মনে হয় না।’
খামারবাড়ি এলাকায় কথা হয় আইনজীবী হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে। জানাজায় অংশ নিতে নিজ খরচে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছেন। তিনি বলেন, ‘এমন আপসহীন নেত্রী বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব কম এসেছে। শেষ বিদায়ে শরিক না হলে নিজের কাছেই অপরাধ মনে হতো। এই জানাজা বিএনপির জন্য শুধু শোকের নয়, উজ্জীবনেরও বার্তা। দীর্ঘদিন নিপীড়ন, বিভাজন ও ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দলটি হঠাৎ আবিষ্কার করল– তার সামাজিক শিকড় এখনও অটুট। মানুষ দেখাল, তারা খালেদা জিয়াকে ভুলে যায়নি।’
ভোলার চরফ্যাসন থেকে আসা মো. সোলেমান শীতের কারণে লঞ্চে দেরিতে পৌঁছেছেন। শরীরও ভালো নেই। তবু এসেছেন। বললেন, ‘নেত্রীর জন্য একটা আলাদা টান কাজ করেছে। চুপচাপ জানাজায় দাঁড়িয়ে দোয়া করাই আমার চাওয়া।’
নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে আসা আবু বকর বলেন, ‘আমরা কোনো মিছিল বা স্লোগানের জন্য আসিনি। শুধু শেষবারের মতো সম্মান জানাতে এসেছি।’রাজশাহী থেকে আসা ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপির প্রবীণ কর্মী ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘নেত্রীর মৃত্যুতে মনে হচ্ছে, আমাদের মাথার ওপর থেকে একটা ছায়া সরে গেছে।’সিলেট থেকে আসা বিএনপিকর্মী জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আজ কোনো শোডাউনের দরকার নেই। নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখা আর জানাজায় দাঁড়ানোই সবচেয়ে জরুরি।’সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থেকে আসা ৫০ বছর বয়সী মোহাম্মদ শাকিল কোনো দিন রাজনীতি করেননি। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর শোনার পর রাতের বাসে ঢাকায় আসেন। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম আছে। দেশ ছেড়ে কোথাও যাননি। এটাই আমার শ্রদ্ধার জায়গা।’
মানিকগঞ্জের রিফাত উদ্দিন এসেছেন মায়ের কথায়। বললেন, ‘মা পাঠাইছে জানাজায়। তাই এসেছি।’ গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ষাটোর্ধ্ব সিফাতুর রহমান পায়ে ব্যথা নিয়েই হাঁটছেন। বললেন, ‘কষ্ট লাগছে না। দেশনেত্রীর জানাজায় থাকতে পারছি– এটাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।’
ভিড় এত বেশি যে, সামনে এগোনো কঠিন। অনেকেই জানাজাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেননি। নীলফামারী থেকে আসা বিএনপিকর্মী রিয়াজুল ইসলাম ভিড়ের মধ্যে সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলেছেন। ফোনে চেষ্টা করেও পাচ্ছিলেন না। রিয়াজুল বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে রওনা দিয়ে ঢাকায় এসেছি। শেষ বিদায়ে না থাকলে মন মানত না।’
অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান বড় ভাইয়ের হাত ধরে বারবার সামনে যেতে চাচ্ছে, পারছে না। আদনান বলেন, ‘ইচ্ছা ছিল সামনে দাঁড়িয়ে জানাজা পড়ব। তবে পারব বলে মনে হয় না।’চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা কলেজ শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘খালেদা জিয়ার জানাজা শুধু একটি বিদায় নয়। এটি ছিল একটি প্রশ্নের নীরব উত্তর–বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনতার হৃদয় কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? দীর্ঘ বছর খালেদা জিয়া ছিলেন ক্ষমতার বাইরে। কারাবন্দি, অসুস্থ ছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের এই জনসমুদ্র প্রমাণ করল– রাজনীতি শুধু প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে না, মানুষের অনুভূতিও একে চালায়। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই অনুভূতির সাক্ষ্য হয়ে থাকবে এই জানাজা।’
নেত্রকোনা থেকে মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় আসেন সৌদিপ্রবাসী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স ৩০ বছর। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তার পুরোটা সময় দেখছি খালেদা জিয়া সংগ্রাম করেছেন, তাঁর ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। এত কিছুর পরও তাঁর মুখ থেকে কোনো খারাপ কথা শুনি নাই। এই গুণ দেখে আমি বিএনপির সমর্থন করি।’
ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে এসেছেন কৃষক মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, ‘দেশের জন্য তাঁর (খালেদা জিয়া) যে টান, তা বলে বুঝানো যাবে না। দেশের জন্য জীবন দিয়ে দিলেন, তবু বিদেশে গিয়ে থাকলেন না। তাঁর একটা ভিডিও মারা যাওয়ার পর থেকে বারবার দেখি। তিনি বলেছেন, তাঁর বিদেশে কোনো ঠিকানা নেই, দেশেই সব। তাঁর মতো কেউ দেশকে ভালোবাসল না।’
আরও পড়ুন বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক খালেদা জিয়া
ঢাকাভয়েস/এই
.jpg)

No comments