বিগত তিন নির্বাচনের আগে ঘটে ব্যাপক গুমের ঘটনা
দেশে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়। আর এসবের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ খোদ গোয়েন্দা সংস্থার বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তা। সূত্রে জানা গেছে, গুমের অভিযোগ উঠেছে র্যাব, পুলিশ, ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের বিরুদ্ধে। গুমসংক্রান্ত কমিশনের দাবি, গোয়েন্দা সংস্থার অপব্যবহার বন্ধে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। গুম কমিশনের তথ্যমতে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়। তা ছাড়া ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনের আগে দেশে ব্যাপক গুমের ঘটনা ঘটেছে। এখনো নিখোঁজ বেশির ভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি। তবে গুমের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষ আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে বেশ কিছু পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল। তাদের দাবি, গোয়েন্দা সংস্থার অপব্যবহার বন্ধে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তাহলেই এসব অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
তা ছাড়া বর্তমান সরকারি বাহিনী ও গুমসংক্রান্ত কমিশনের তথ্যমতে, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র্যাব জড়িত, এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপক হারে মানুষকে গুম করেছে। বহুক্ষেত্রে সাদা পোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে গুম-অপহরণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে এ কাজে যুক্ত করা হয়। তদন্তে মোট ৪০টি বন্দিশালা পেয়েছে কমিশন। এর মধ্যে র্যাবের ২২ থেকে ২৩টি। গুম কমিশন কাজ শুরু করার পর র্যাব সবচেয়ে বেশি আলামত ধ্বংস করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে গুমের মাধ্যমে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়েছে। গুমের পর হত্যা করা হয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে। গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত সংগঠনটিও সেই তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরেছে; কাজেই আওয়ামী লীগ সরকার কতটা অপরাধে যুক্ত ছিল, সেটা কিন্তু সবার সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, বিগত সরকারের সময়ে দেশে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়। সরকার এসব কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চরমভাবে ব্যবহার করেছে। গুমের অভিযোগ বেশি র্যাব ও পুলিশের বিরুদ্ধে। এর সঙ্গে সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআইও ব্যাপক হারে গুম করেছে বলে তথ্যে উঠে এসেছে। তবে এটি নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা সংস্থার অপব্যবহার বন্ধ করা দরকার। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ডেপুটেশনে র্যাব বা গোয়েন্দা সংস্থায় যাওয়া সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের ‘গুম-চাঁদাবাজিতে’ জড়ানোর বিষয়টি তাদের মূল বাহিনী জানলেও কিছু করার ছিল না। যখন আর্মির কোনো অফিসার র্যাবে এসে কাজ করেন, তখন তিনি আর্মির কমান্ডের বাইরে থাকেন। আর্মি কিন্তু কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে না। আর ডিজিএফআই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে দায়বদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী থাকেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। সুতরাং আর্মির কমান্ড কিছু করতে পারে না। তবে আর্মির হাইকমান্ড অবগত না থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু তারা অ্যাকশন নিতে পারতেন না। আর্মি অ্যাজ আ ফোর্স, গুমে যুক্ত ছিল না। কিন্তু আর্মির যেসব অফিসার বা এয়ারফোর্স বা নেভির যেসব অফিসার ডেপুটেশনে র্যাব, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ে ছিলেন, তাদের বেশির ভাগেরই গুম ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ততা পাওয়া গেছে। সে জন্য আমরা বলেছি সব সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে আর্মড ফোর্সকে উইথড্র করার জন্য।
দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন সময়ে ‘অপব্যবহার’ করার বিষয়টি উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে গুমসংক্রান্ত কমিশন। কমিশনের মতে, সেনাবাহিনীর কাজ সেনানিবাসে প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা; অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কেবল পুলিশের। সূত্রমতে ও ‘মায়ের ডাক’-এর তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে গুম থাকা ৭০৫ জনের মধ্যে এখনো ৩৫০ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান পাননি স্বজনেরা। পথ চেয়ে বসে আছে ওই সব নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার। গুমের বর্বরতা দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এমনকি জাতিসংঘও দিয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
এ বিষয়ে ‘মায়ের ডাক’-এর অন্যতম সমন্বয়ক ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির মনোনীত পদপ্রার্থী সানজিদা তুলি জানান, আওয়ামী দুঃশাসনের সময়ে গুমের ঘটনার নেপথ্যে সব থেকে বেশি ভূমিকা রেখেছে র্যাব। গুমের ২৫ ভাগই র্যাবের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে র্যাব বিলুপ্তিসহ একগুচ্ছ সুপারিশও করা হয়। ওই সুপারিশে ফ্যাসিস্ট আমলে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নানা অপতৎপরতার বিষয়ও সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কাজেই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গোয়েন্দারা ছিল ভয়াবহ অপরাধের মধ্যে।
এদিকে এসব নিয়ে অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের বিশিষ্টজন গুমসংক্রান্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দিলেও র্যাব বিলুপ্তি নয় বরং সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া উচিত। এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। অপরাধ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিগত বিএনপি সরকারের আমলে সেই সময়ের বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই র্যাব গঠন করা হয়েছিল। সন্ত্রাস দমনে র্যাবের সফলতাও পেয়েছিল মানুষ। তবে পরে ব্যক্তিস্বার্থে র্যাবের কিছু কিছু কর্মকর্তার কর্মকা-ে সমালোচনার মুখে পড়ে পুরো বাহিনী। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হলে র্যাব আরও জনকল্যাণমূলক কাজ করবে বলে মনে করছেন তারা। এ ছাড়া বিশেষ কাজের জন্য র্যাব ফোর্স থাকলেও সেখান থেকে সামরিক বাহিনীর লোকদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন বিশ্লেষকেরা।
র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশের বিষয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ‘আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুমের প্রসঙ্গ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। তবে জুলাই বিপ্লবের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু পরিবর্তনের দাবি করেছিল সাধারণ মানুষ; সেটাও সঠিকভাবে পালন করা হয়নি। তাছাড়া বাংলাদেশে অধিকাংশ সময় যারা সরকারে থাকেন, তাদের দোষারোপ করা হয় যে, সরকার তাদের দিয়ে কাজগুলো করিয়েছে। কিন্তু উভয় বাস্তবতাই আছে। যারা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, তারা সরকারের কাছে আস্থাভাজন হওয়ার জন্য কিংবা নিজের সুবিধা ও ভালো পদায়ন-পদোন্নতির জন্য কখনো কখনো নিজ উদ্যোগে সরকারকে এ ধরনের নীতি বা অধিকারবহির্ভূত পরামর্শ দেন। সরকার তখন চিন্তা কওে, এর ফলে বিরোধী দলকে দমনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা সহজ হবে। তখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা এ ধরনের পরামর্শ গ্রহণ করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জবাবদিহিমূলক পরিবেশের আওতায় আনতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে ভবিষ্যতে তাদের আইনের মুখোমুখি করতে হবে। পাশাপাশি বিগত র্যাবের যে ধরনের কর্মকা- ছিল, তাতে জনগণ খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। সেই জায়গা থেকে অনেকেই মনে করছেন, এটা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দরকার; কিন্তু বিলুপ্ত করে দেওয়াই সমস্যার সমাধান নয়। এটা সংস্কার করলে ভালো ফলাফল হবে।
র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশের বিষয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আশরাফুল হুদা বলেন, র্যাব গঠনের সময় সিদ্ধান্ত ছিল, রাজনৈতিকভাবে তাদের ব্যবহার করা হবে না। বিএনপি আমলে র্যাব যখন গঠন করা হলো, তখন তাদের কর্মকা-ে সাধারণ মানুষ খুশি ছিল। বিএনপি আমলে দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে, হত্যা হয়েছে, যেটা আমরা ফিল করেছি, আলোচনাও হয়েছে। ওই সব ক্ষেত্রে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। র্যাব একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল, উদ্দেশ্যও ভালো ছিল। বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছিল র্যাব। শুধু পুলিশ দিয়ে র্যাব গঠন করলে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনেকের সংশয় ছিল।
নিখোঁজ বেশির ভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি :
গুমের শিকার ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ মন্তব্য করে সরকারের গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি গুমের শিকার হয়ে এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে, অন্তত তাদের দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাও হয়েছে। কিন্তু আমরা পাইনি। এখনো আইসিটির তদন্ত দল এটা তদন্ত করলে আমরা জানতে পারি। নিখোঁজ ২৫১ জনের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের বেশির ভাগই আওয়ামী রেজিমের বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছিলেন। প্রধানত বিএনপি ও জামায়াত বা তাদের অঙ্গ সংগঠনের। আরেকটা প্যাটার্ন ছিল, প্রতিটা সাধারণ নির্বাচনের আগে গুম ম্যাসিভ স্কেলে শুরু হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনগুলোর আগে এ ঘটনা ঘটেছে। ‘গণতন্ত্রহীনতার সঙ্গে গুম হওয়ার’ কোনো সম্পর্ক কমিশন পেয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অবশ্যই! সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন, এমনকি ব্যাপক আকারে গুমের মতো কৌশল প্রয়োগ করে হলেও। এটা একদম পরিষ্কার, এটা অস্বীকার করা যাবে না।


No comments