Adsterra

লোড হচ্ছে...

কারাবন্দী ইমরান খান কি পাকিস্তানের গণতন্ত্রের বরপুত্র?

কারাবন্দী ইমরান খান কি পাকিস্তানের গণতন্ত্রের বরপুত্র,

ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আজ অদ্ভুতভাবে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি শহরের ১৩ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত আদিয়ালা কারাগারের ৮০৪ নম্বর কোষে থাকা সত্ত্বেও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং তিনি একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যা বহু মানুষ সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে করেন।

ইমরান খান যে কারাগারে আছেন, সেখানে ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল। এ জেলে কারাবন্দি ছিলেন বেনজির ভুট্টো, নওয়াজ শরিফসহ বহু রাজনীতিক। সম্প্রতি খবর ছড়ায়, ইমরান কারাগারে ইন্তেকাল করেছেন। এই খবর ভুল। তবে তাঁকে একাকী রাখা হয়েছে, যেখানে সাধারণ ফাঁসির আসামিদের রাখা হয়।

২০২৫ সালে ইমরান খানের জন্য বিশেষভাবে কষ্টকর বছর। জানুয়ারিতে আল-কাদির ট্রাস্ট মামলায় তাঁকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০ ডিসেম্বর, দুর্নীতির মামলায় ইমরান ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছরের সাজা দেয়া হয়। পরিবার ও আইনজীবীদের সাক্ষাতে বাধা এবং মানবিক অবস্থা আন্তর্জাতিক মহলকে উদ্বিগ্ন করেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এটিকে ‘মানসিক নির্যাতন’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন।

ইমরানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের সমর্থকরা প্রতিবাদ করে মুক্তি দাবি করলেও কোনো বড় সাফল্য হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আপাতত ইমরান খানের রাজনৈতিক ময়দানে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নেই। নির্বাচনী প্রতীক হারানো, দলীয় কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং সভা-সমাবেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে দলের কার্যক্রম সীমিত। তবে শহুরে তরুণ ও মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখাওয়া অঞ্চলের সমর্থকরা এখনো পিটিআইকে তাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াইকারী হিসেবে দেখেন।

ইমরানের সঙ্গে ভারতীয় কংগ্রেস নেতা ও লেখক শশী থারুরের ব্যক্তিগত আলাপচারিতার স্মৃতি রয়েছে। তিনি মন্তব্য করেছেন, ক্রিকেট, রাজনীতি ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে ইমরান Khan স্পষ্টভাষী, তর্কপ্রবণ এবং চ্যালেঞ্জ স্বীকার করতে প্রস্তুত। দুই দেশের উত্তেজনার মাঝেও তিনি ভারতে জনপ্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা তুমুল। ক্রিকেটের উত্তরাধিকার এবং ব্যক্তিগত ভদ্রতা তাঁকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

লাহোরে ১৯৫২ সালে সম্ভ্রান্ত পশতুন পরিবারে জন্ম নেওয়া ইমরান ক্রিকেটের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সেখানে কাউন্টি ক্রিকেট খেলে নেতৃত্বের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন। অধিনায়কত্বের মাধ্যমে দলকে একত্রিত করা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া শিখেছেন।

ক্রিকেটার হিসেবে ১৯৭০-এর দশকে তার উত্থান। মাতৃবংশের ক্রিকেট প্রভাব তাকে সহায়তা করেছে। ১৯৯২ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে দাঁড় করানোর পরই তিনি অবসরে যান। জনতার ভালোবাসা তাঁকে ফিরে আনে। আত্মজীবনী ‘অলরাউন্ড ভিউ’তে লিখেছেন, দল এবং সাধারণ জনগণের চাপের কারণে অবসরে যেতে বাধ্য হন।

১৯৯৪ সালে তিনি মানবসেবার উদ্দেশ্যে শওকত খানুম মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে এটি পাকিস্তানের প্রথম ক্যানসার হাসপাতাল হিসেবে খ্যাতি পায়। সাধারণ মানুষের অনুদানে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই প্রতিষ্ঠান ইমরানের জনপ্রিয়তা এবং জনগণের সঙ্গে গভীর সংযোগের প্রমাণ।

১৯৯৬ সালে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দল গঠন করেন। প্রথম দিকে প্রভাব কম হলেও ২০১০ সালের পর দলের উত্থান ঘটে। দুর্নীতিবিরোধিতা, জাতীয় মর্যাদা ও ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তিনটি মূল স্লোগান তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে পিটিআই জোট সরকার গঠন করে এবং ইমরান প্রধানমন্ত্রী হন। ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে অর্থনীতি ও প্রশাসনে চ্যালেঞ্জ ও ‘ডিপ স্টেট’ এর প্রভাব তাঁকে কঠিন লড়াইয়ে নামায়। পাকিস্তানে ক্ষমতায় আসার জন্য সেনার সহযোগিতা লেগেছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ডিপ স্টেটের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত ঘটে।

ইমরান খানের শাসনামল অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পররাষ্ট্রনীতি ও কিছু সাফল্য থাকলেও সরকার দুর্বল মনে হয়। বিরোধী দলগুলো একজোট হয়ে ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

রাশিয়া সফরকালে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক ও ইউক্রেন আক্রমণের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং সেনা-রাজনীতির মিলিত প্রভাবই ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর একাধিক মামলা, গ্রেপ্তার এবং দমন শুরু হয়। ২০২৩ সালের আগস্টে কারাগারে যান। বর্তমানে ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন, আর ২০ ডিসেম্বর নতুন ১৭ বছরের সাজা হয়েছে।

কারাগারে থাকা সত্ত্বেও ইমরানের রাজনৈতিক প্রভাব অটুট। তাঁকে ‘কাসিমের বাবা’ হিসেবে উল্লেখ করে সমাজ থেকে ধীরে ধীরে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সমর্থকরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে আন্দোলন চালাচ্ছেন। বার্সেলোনা, লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর মুক্তির জন্য তদবির চলছে।

পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীরা অতীতেও কারাবন্দী হয়েছেন। ১৯৭৯ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো ফাঁসি প্রাপ্ত হন। এরপর সকল প্রধানমন্ত্রীরা কারাগার থেকে জীবিত বেরিয়েছেন, কেউ কেউ ক্ষমতায় ফিরেছেন। সেনাবাহিনী ও ‘প্লেবুক’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করে।

নতুন ‘সুলতান’ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির পাকিস্তানের সব নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর নির্দেশনায় কার্যকর করছেন।

ইমরান খান জাতীয় নায়ক, আন্তর্জাতিক আইকন, সংস্কারের নেতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতীক। দুই বছরের কারাগারের পরও ৭৩ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তানের সবচেয়ে জোরালো বিরোধী কণ্ঠ। সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের ‘সূর্যসন্তান’। তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন, একদিন কারাগারের দিন শেষ হবে, আর তিনি ২৪ কোটি মানুষের নেতৃত্ব নেবেন।

No comments

Powered by Blogger.