মাদুরোর আগে সাদ্দামকে উৎখাত করে এই ডেল্টা ফোর্স
মার্কিন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে অভিজাত ও অত্যন্ত গোপনীয় স্পেশাল মিশন ইউনিট হলো ‘ডেল্টা ফোর্স’। আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম ‘ফার্স্ট স্পেশাল ফোর্সেস অপারেশনাল ডিটাচমেন্ট—ডেল্টা’। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের অভিযানে এই বাহিনীর সম্পৃক্ততা আবারও তাদের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার জানান দিয়েছে।
১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষায়িত ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে পেন্টাগন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্নেল চার্লস বেকউইথ ব্রিটিশ বিশেষ বাহিনী ‘এসএএস’-এর আদলে ১৯৭৭ সালে এই ডেল্টা ফোর্স গঠন করেন। উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে এর প্রধান কার্যালয়।
অত্যন্ত গোপনীয়তার কারণে ডেল্টা ফোর্সকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন নামে ডাকা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্মি কম্পার্টমেন্টেড এলিমেন্টস (এসিই), কমব্যাট অ্যাপ্লিকেশনস গ্রুপ (সিএজি) বা সংক্ষেপে ‘ডেল্টা’।
ডেল্টা ফোর্স মূলত এমন সব মিশনে অংশ নেয়; যা সাধারণ বাহিনীর সক্ষমতার বাইরে। যেমন—হাইপ্রোফাইল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মূল উৎপাটন করা। বিমান, জাহাজ বা দুর্গম কোনো এলাকা থেকে জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনা। হাইভ্যালু টার্গেট আটক বা শীর্ষ পর্যায়ের শত্রু বা রাষ্ট্রপ্রধানদের পাকড়াও করা (যেমনটি মাদুরোর ক্ষেত্রে ঘটল)। শত্রুর সীমানার ভেতরে ঢুকে গোপন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা রেকি ও নজরদারি চালানো।
ডেল্টা ফোর্সের কিছু সফল অপারেশন
ডেল্টা ফোর্সের অধিকাংশ মিশনই অত্যন্ত গোপনীয় (Classified)। তবে সময়ের সঙ্গে কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযানের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। যেমন—১৯৯৩ সালে সোমালিয়ার মোগাদিশুতে ঐতিহাসিক ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ মিশনে অংশ নিয়েছিল এই ডেল্টা ফোর্স। ২০০১ সালে তোরা বোরা পাহাড়ে ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করার অভিযানে ডেল্টা ফোর্স মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
২০০৩ ইরাকে একটি ভূগর্ভস্থ গর্ত থেকে সাদ্দাম হোসেনকে খুঁজে বের করেছিল এই ডেল্টা ফোর্স। ২০১৯ সালে সিরিয়ায় আইএসের প্রধান বাগদাদির গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে আত্মঘাতী হতে বাধ্য করেছিল ডেল্টা ফোর্স।
সর্বশেষ এক রাতের অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই বিশেষ ইউনিট।
কারা হতে পারে এই বাহিনীর সদস্য?
ডেল্টা ফোর্সে যোগ দেওয়া বিশ্বের কঠিনতম কাজগুলোর একটি। এর সিলেকশন প্রক্রিয়া এতটাই কঠোর যে শতকরা ৯০ ভাগের বেশি প্রার্থী ঝরে পড়ে। সাধারণত মার্কিন ‘গ্রিন বেরেট’ বা ৭৫তম রেঞ্জার ইউনিট থেকে অভিজ্ঞদের এখানে নেওয়া হয়।
প্রথম ধাপে প্রার্থীদের ৪৫ পাউন্ড (প্রায় ২০ কেজি) ওজনের ব্যাগ নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৪০ মাইল (প্রায় ৬০ কিলোমিটার) দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়। একে বলা হয় ‘দ্য লং ওয়াক’ (The Long Walk)।
মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যাচাই করতে নেওয়া হয় বিশেষ মানসিক পরীক্ষা। এই ধাপ পেরোনোর পর প্রার্থীরা ছয় মাসের অপারেটরস ট্রেনিং কোর্সে (ওটিসি) অংশ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের জন্য প্রস্তুত বিশেষ বাহিনীর সদস্যে পরিণত হন।
অভিযান শেষে একজন ডেল্টা ফোর্স সদস্য কখনোই নিজেকে প্রকাশ করেন না। তাঁদের মূলমন্ত্রই হলো—‘Quiet Professionals’ বা নিভৃতচারী পেশাদার। আজকের এই আধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তির যুগে ডেল্টা ফোর্সকে মনে করা হয় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সবচেয়ে ধারালো ও অপ্রতিরোধ্য অস্ত্র।


No comments