Adsterra

লোড হচ্ছে...

নির্বাসন যাদের জনপ্রিয়তাকে আরও শক্তিশালী করেছে

 

নির্বাসন যাদের জনপ্রিয়তাকে আরও শক্তিশালী করেছে, ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News

রাজনীতির পথ কখনই মসৃণ নয়। বিশেষ করে যারা গণমানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, তাদের অনেককেই বরণ করতে হয়েছে কারাবাস কিংবা দীর্ঘ নির্বাসন। অবশ্য নিজ দেশে কারাবাসী কিংবা ভিনদেশে বছরের পর বছর কাটাতে হলেও ফুরিয়ে যাননি তাদের সবাই। বরং কেউ কেউ প্রবল জনসমর্থন নিয়ে রাজকীয় মর্যাদায় দেশে ফিরেছেন। জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বও পেয়েছেন কেউ কেউ। ইতিহাসের পাতা থেকে এমন কয়েকজন বিশ্বখ্যাত নেতার জীবনপ্রবাহ তুলে ধরা হলো, যারা নির্বাসন শেষে বীরের বেশে ফিরেছিলেন নিজ মাতৃভূমিতে; নির্বাচিত হয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার ভাগ্যবিধাতা নেলসন ম্যান্ডেলা : বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন ছিল এক দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। তার দীর্ঘ সময় কেটেছে কারাবন্দি অবস্থায়। তিনি সরাসরি নির্বাসিত হয়েছিলেন, তা বলা যায় না। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে তিনি গোপনে দেশ ছেড়েছিলেন। মরক্কো ও ইথিওপিয়ায় সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং লন্ডনে রাজনৈতিক তৎপরতা শেষে দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। টানা ২৭ বছরের কারাজীবন শেষে ১৯৯০ সালে মুক্তি পান তিনি। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথমবার

সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।

ফরাসি মুক্তির নায়ক চার্লস দ্য গল : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর হাতে ফ্রান্সের পতনের পর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চার্লস দ্য গল লন্ডনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেখান থেকেই তিনি ‘ফ্রি ফ্রেঞ্চ ফোর্সেস’ পরিচালনা করেন এবং দেশবাসীকে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। ১৯৪৪ সালে প্যারিস মুক্ত হওয়ার পর তিনি বীরের বেশে ফিরে আসেন। মাঝখানে কিছুকাল রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। ১৯৫৮ সালে আলজেরীয় সংকটের সময় তিনি আবারও সক্রিয় হন এবং ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

গণতন্ত্রের রাজকুমারী বেনজির ভুট্টো : মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর রাজনৈতিক জীবন ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। আশির দশকে সামরিক জান্তা জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে বাবার ফাঁসি ও কারাবরণ শেষে তিনি যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে যান। ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানে ফিরে এলে তাকে স্বাগত জানাতে লাহোরের রাস্তায় লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তীকালে আবার তাকে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল। ২০০৭ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাসন থেকে ফেরার পর তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনসভায় আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। তাকে ‘প্রাচ্যের কন্যা’ ও ‘গণতন্ত্রের রাজকুমারী’ বলা হয়। রাজনৈতিক দৃঢ়তার কারণে অনেক সময় তাকে লৌহমানবীও হিসেবে অভিহিত করা হয়।

আর্জেন্টিনার জননায়ক হুয়ান পেরন : আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে হুয়ান পেরন এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৫৫ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ১৮ বছর প্যারাগুয়ে, ভেনেজুয়েলা ও স্পেনে নির্বাসিত জীবন কাটান। বিদেশে থেকেও তিনি আর্জেন্টিনার মানুষের হৃদয়ে তার প্রতি ভালোবাসা ধরে রেখেছিলেন। ১৯৭৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে দেশে ফিরে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন এবং ৬১ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এটি আর্জেন্টিনার নির্বাচনী ইতিহাসের অন্যতম বড় বিজয়।

ইসলামী বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ খোমেনি : ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রধান রূপকার আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিকে প্রায় ১৫ বছর নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে। তৎকালীন শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির কট্টর সমালোচনা করার দায়ে ১৯৬৪ সালে তাকে প্রথমে তুরস্ক এবং পরে ইরাকের নাজাফে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নির্বাসনের শেষ দিকে তিনি প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থান করে বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কাড়েন। সেখান থেকেই অডিও ক্যাসেট ও বার্তার মাধ্যমে তিনি ইরানি জনগণের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন। ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার প্রত্যাবর্তন ছিল ইতিহাসের অন্যতম জনবহুল সংবর্ধনা। ফিরে আসার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় বিপ্লব সফল হয় এবং তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে দেয়। ইরানে সর্বোচ্চ নেতাই রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা।

ফিলিপাইনের ত্রাতা কোরাজন অ্যাকুইনো : ফিলিপাইনের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে কোরাজন অ্যাকুইনো এক অনন্য নাম। আশির দশকের শুরুতে স্বামী বেনিনো অ্যাকুইনোর সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ছিলেন। ১৯৮৩ সালে নির্বাসন থেকে ফেরার পথে বিমানবন্দরেই তার স্বামীকে হত্যা করা হলে ফিলিপাইনের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা ও গণবিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শোকাতুর অ্যাকুইনো সাধারণ জীবন ছেড়ে জনগণের দাবির মুখে স্বৈরাচারী ফার্দিনান্দ মার্কোসের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হাল ধরেন। ১৯৮৬ সালের ঐতিহাসিক ‘পিপল পাওয়ার রেভল্যুশন’-এর মুখে মার্কোস ক্ষমতা ছেড়ে পালান। তখন অ্যাকুইনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি দেশটিতে পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই নেতাদের নির্বাসন তাদের জনপ্রিয়তাকে মøান করার পরিবর্তে আরও শক্তিশালী করেছে। জনগণের সঙ্গে তাদের আত্মিক বন্ধনই তাদের পুনরায় ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, স্বৈরাচারী শাসনের অবসান বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এই নেতারা ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

১৭ বছরেরও বেশি সময় নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে আজ দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে অন্যতম প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি। তার এই ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে সামনে রেখে সম্প্রতি দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক, রেডিও-টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে ‘তারেক রহমানÑস্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটি’। এতে উপস্থিত সুধীজনের আলোচনায়ও উঠে এসেছে, দেশে এখন যে পরিমাণ বিরোধ-বিভেদ আর সংকট দেখা দিয়েছে, এ থেকে উত্তরণে তারেক রহমানই পারেন তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে তিনিই হতে পারেন কাণ্ডারি।

বিগত দিনগুলোতে দেশের বাইরে থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার দেশে ফেরার প্রক্রিয়া এবং তাকে কেন্দ্র করে যে জনআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তা ইতিহাসের সেসব নির্বাসিত নেতার স্মৃতিই মনে করিয়ে দিচ্ছে, যারা বীরদর্পে ফিরে এসে জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

No comments

Powered by Blogger.