কোনো প্রতিহিংসা নয়, কোনো ধ্বংস নয়
রাজনীতিতে তাঁর ওপর সীমাহীন অত্যাচার, নির্যাতন হলেও কখনও প্রতিহিংসায় বিশ্বাসী ছিলেন না বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সবসময় প্রতিশোধ, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ভালোবাসা ও শান্তির কথা বলতেন। সবসময় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব নিয়ে নিজের আপসহীনতার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
সর্বশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সংসদ ভবনের এলডি হলের মাঠে বিএনপির বর্ধিত সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তৃতা করেন খালেদা জিয়া। সেখানে ছাত্র-যুবকসহ দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ধ্বংস, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ নয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থেই একটি বাসযোগ্য উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করি।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি মুক্তি পান। দেশের ওই টালমাটাল অবস্থায় ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। সেখানেও তিনি প্রতিহিংসার পরিবর্তে দেশ গঠনে সবার প্রতি আহ্বান জানান। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছিলেন, তরুণরা যে স্বপ্ন নিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে মেধা, যোগ্যতা, জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপে নতুন স্বপ্ন
রক্তাক্ত জুলাই অভ্যুত্থানের পর গভীর অসুস্থতা নিয়েও হাসাপাতালে বসে প্রথম ভার্চুয়াল ভাষণে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের নায়কদের অভিনন্দন জানান। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা অবৈধ ফ্যাসিবাদী সরকারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের বীর সন্তানদের, যারা মরণপণ সংগ্রাম করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। শত শত শহীদকে জানাই শ্রদ্ধা। এ বিজয় আমাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। এ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আমাদের নির্মাণ করতে হবে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই
সেনাসমর্থিত সাবেক এক-এগারো সরকার এবং তৎপরবর্তী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ও খালেদা জিয়াকে দেশত্যাগে নানামুখী চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু ক্রমাগত চাপ উপেক্ষা করে দেশনেত্রী তাঁর এক আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ, এই দেশের মাটি ও মানুষই আমার সবকিছু। কাজেই আমি কোনোভাবেই দেশের বাইরে যাব না।’
কাউকে খাটো নয়
নবম জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ২০১৩ সালের জুন মাসে তিনি এক দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। এখানেও তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরিহার, জাতীয় নেতাদের যথাযথ সম্মান প্রদানের কথা বলেন। তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন নীতির কড়া সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘আমরা কাউকে খাটো করে দেখতে চাই না। সবাইকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে চাই। প্রত্যেকের সাফল্য ও ব্যর্থতা মূল্যায়নের ভার ছেড়ে দিতে চাই ইতিহাসের ওপর।’
দেশটা কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়
বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর চালানো দমন-পীড়ন এবং অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে পুলিশি বাধার অংশ হিসেবে গুলশানে বালুর ট্রাক রেখে খালেদা জিয়ার কার্যালয় অবরুদ্ধ করা হয়। এ সময় অবরুদ্ধ অবস্থায় তিনি তৎকালীন সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘দেশটা কি আপনার একার? পৈতৃক সম্পত্তি হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের গুন্ডা বাহিনী দিয়ে, পুলিশ বাহিনী দিয়ে আমাদের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চান। সাহস থাকে তো পাল্টা অনুষ্ঠান করে দেখাবেন। সাহস নেই, ১০টা লোকও আসে না। না হলে এমন করুণ পরিণতি হয়।’
তবে ফ্যাসিবাদী সরকারের চরম দমননীতির মধ্যেও বিএনপি চেয়ারপারসন গণতন্ত্রে উত্তরণের কথা বলে গেছেন। ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর এক বিশাল সমাবেশে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলে ধরে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন।
পররাষ্ট্র নীতিতেও ছিল দেশপ্রেম
‘আমরা সবাইকে বন্ধু হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু কেউ যদি আমাদের বন্ধুর বেশে প্রভু হতে চায়, সেটা আমরা কখনও মেনে নেব না। মানতে দেব না। কারও প্রভুত্ব বাংলাদেশের জনগণ স্বীকার করবে না।’
এভাবেই দেশ ও জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন। আমৃত্যু এমন অবস্থানের কারণেই আপামর জনতা তাঁকে আপসহীন নেত্রীর খেতাব দেয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বেশির ভাগ বক্তব্যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা, একনায়কতন্ত্র এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ইস্পাতকঠিন দৃঢতার উপাদান মেলে।
আরও পড়ুন বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক খালেদা জিয়া
ঢাকাভয়েস/এই

No comments