ইশতেহারে পানি, স্বাস্থ্যবিধি অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ
নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) নিশ্চিত করা কেবল উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার– এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, সংসদ সদস্য প্রার্থী, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
তারা বলেছেন, সুস্থ জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই খাতকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না করলে জনস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ– কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে মানবাধিকারভিত্তিক, জলবায়ু সহনশীল ও প্রতিবন্ধীবান্ধব নীতির মাধ্যমে ওয়াশ খাতকে নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
গতকাল সোমবার রাজধানীর হোটেল ঢাকা শেরাটনে ওয়াশ নেটওয়ার্কগুলোর সমন্বিত নেটওয়ার্কের উদ্যোগে আয়োজিত ‘সবার জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে জাতীয় অঙ্গীকার’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহার সংলাপে এমন দাবি ও প্রতিশ্রুত উঠে আসে। সংলাপে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ (এবি পার্টি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, গবেষক ও উন্নয়নকর্মী অংশ নেন। সংলাপ আয়োজক ওয়াশ নেটওয়ার্কসমূহের সমন্বিত নেটওয়ার্ক তত্ত্বাবধান করছে ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
সংলাপে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ‘নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার। গ্রাম ও শহরের মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধায় ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপের ব্যবহার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে।’
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য পাবলিক টয়লেটের সংকট প্রকট। বিএনপির নীতিগত অবস্থান তুলে ধরে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেন, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিএনপি নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায়। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর করতে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের ওপর আমরা জোর দিচ্ছি। রাজধানীর কড়াইলসহ বিভিন্ন বস্তি এলাকার বাস্তবতা তুলে ধরে ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামান বলেন, পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু যখন মানুষ পানির কারণে অসুস্থ হয় বা মারা যায়, তখন সেই পানি আর জীবন থাকে না– তা হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ। ঢাকা শহরের ভেতরেই এমন সব এলাকা আছে, যেখানে মানুষ চরম অমানবিক পরিবেশে বসবাস করছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে এসব এলাকায় ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ পানিবাহিত রোগ নিয়মিত ঘটনা।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এই রোগগুলো প্রতিরোধ করতে পারতাম, তাহলে ওষুধ ও চিকিৎসায় যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার দশ ভাগের এক ভাগও খরচ হতো না।’জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা-১৬ আসনের মনোনীত প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল বাতেন বলেন, ‘রাজধানীর বিহারি ক্যাম্প ও বস্তিগুলোতে ওয়াশ পরিস্থিতি ভয়াবহ। রাজনৈতিকভাবে এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত।’
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, অতীতে খাল ও নদীকেন্দ্রিক যে যোগাযোগ ও পানিব্যবস্থা ছিল, তা পরবর্তী সময়ে অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে দেশের জলপ্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, জলাবদ্ধতা ও বন্যা বেড়েছে। হাওর এলাকায় অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণের কারণে সিলেটসহ আশপাশের অঞ্চলে নিয়মিত বন্যা দেখা দিচ্ছে।
সংলাপে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, গঙ্গা অববাহিকাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার কারণে গত কয়েক দশকে দেশের শত শত নদী মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতারই প্রতিফলন। পানি ব্যবস্থাপনা ও ওয়াটার পলিটিক্স কখনোই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে আসেনি, যার ফলে সংকট দিন দিন বেড়েছে।
তিনি জানান, এবি পার্টি ইতিমধ্যে পানি, স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন খাতে নীতিনির্ভর রাজনীতির লক্ষ্যে ২১টি পলিসি পেপার প্রণয়ন করেছে এবং দলের ভেতরে একটি ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ গঠন করা হয়েছে। তবে ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ না থাকায় এসব বিষয় গণমাধ্যম ও জাতীয় আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও গবেষক অর্পিতা শ্যামাদেব বলেন, ‘পানি ও স্যানিটেশন নিয়ে দেশে যে গবেষণাগুলো হচ্ছে, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগের সক্ষমতা অনেক বেশি, কিন্তু তা নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে খুব কমই পৌঁছায়।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন খাবারের দোকান, শাকসবজির বাজার, বাথরুম ও পানির উৎস থেকে সংগৃহীত পানিতে বিপজ্জনক মাত্রার ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অথচ মানুষ প্রতিদিন এসব পানি ব্যবহার করলেও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নয়।’
শ্যামাদেব বলেন, ‘নারীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিষয়টি এখনও সামাজিকভাবে অবহেলিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাবলিক প্লেসে নারীবান্ধব টয়লেট, স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন ও নিরাপদ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এই জায়গাগুলোতে আরও পরিকল্পিত কাজ প্রয়োজন।’
সংলাপের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এমএইচএম প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি সালমা মাহবুব। সবার জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার কেন জরুরি তা সমন্বিত নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করেন ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি লিড ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ।
ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক নাবিদ নওরোজ শাহ, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল-মামুন, ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. তাসনিম লস্কর, আপন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এম. আফতাবুজ্জামান, ইডব্লিউপির প্রতিনিধি মো. ফজলুল হক প্রমুখ বক্তব্য দেন।


No comments