ক্রিকেটারদের স্মৃতিতে অম্লান খালেদা জিয়া
দুজন অতিথির জন্য মিষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। সেই অতিথি হলেন হাবিবুল বাশার ও ডেভ হোয়াটমোর। ২০০৪ সালের ঘটনা সেটি। ঢাকা স্টেডিয়ামে ভারতকে প্রথমবার ওয়ানডে ম্যাচে হারিয়েছে বাংলাদেশ। সে খুশিতে কোচ ও অধিনায়ককে মিষ্টি মুখ করান খালেদা জিয়া। একজন প্রধানমন্ত্রীর মাতৃস্নেহে সেদিন পুলকিত হয়েছিলেন বাশার। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এরকম অনেক স্মৃতি আছে ক্রিকেটারদের। সার্ক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে রানার্সআপ হওয়ায় সংবর্ধনা, যুব ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজন, ২০০৬ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এসিসি ট্রফি জয়কে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ী দলকে সংবর্ধনা দেন মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে। কতটা খেলা অন্তপ্রাণ হলে সরকারে ও বিরোধী দলে থাকাকালে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের জন্য নিজ বাসভবনে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। আকরাম খানের মতে, তিনি ক্রীড়া অন্তপ্রাণ। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দৃষ্টিতে খেলোয়াড়দের কাছে মাতৃতুল্য। মোহাম্মদ রফিক, হাবিবুল বাশার, খালেদ মাসুদ পাইলটদের কাছে খালেদা জিয়া ক্রীড়াঙ্গনের আপনজন।
সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্মৃতির অ্যালবাম মেলে ধরেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। ২০০৪ সালে সেই পুরস্কারটা সদ্য প্রয়াত ম্যাডাম খালেদা জিয়া আমার গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন।’
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি স্মৃতি হাতড়ে ফিরে গেলেন ১৯৯৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সার্ক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে, ‘আমরা ওই টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলেছি ভারতের বিপক্ষে। শিরোপা জিততে না পারলেও যমুনায় ম্যাডামের বাড়িতে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। এই যে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম ক্রিকেটকে দেওয়া হয়েছে তা সম্ভব হয়েছে ম্যাডামের কারণে। আরাফাত রহমান কোকো ভাই (প্রয়াত) বহু কষ্টে টাকা জোগাড় করে স্টেডিয়ামটিকে ক্রিকেট খেলার উপযোগী করেছিলেন।’
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক বুলবুল জানান, ‘সহঅধিনায়ক হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতার দেওয়া সংবর্ধনায় রোমাঞ্চিত ছিলেন।’ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেন বুলবুল, ‘আমরা অত্যন্ত মর্মাহত আমাদের একজন মহান নেতা আজকে চলে গেলেন। ক্রীড়াঙ্গন থেকে আমি বলতে পারি, আমরা তাঁকে মিস করব। আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাত দান করেন, তাঁর পরিবারকে শোক সওয়ার শক্তি দেন।’
আইসিসি ট্রফিজয়ী অধিনায়ক আকরাম খান ফিরে গেলেন বিরোধী দলের নেতার সংবর্ধনার স্মৃতিতে, ‘১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জেতার পর বিরোধী দলের নেতা হিসেবে আমাদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। হোটেল পূর্বাণীতে সংবর্ধনার পর মিন্টো রোডে তাঁর বাসায় গিয়ে ডিনার করেছিলাম। অনেক উপহার দিয়েছিলেন। আমার যতটা মনে পড়ে অন্তত তিনবার পুরস্কার ও সংবর্ধনা পেয়েছিলাম ম্যাডামের কাছ থেকে। আরাফাত রহমান কোকো ভাইয়ের স্মৃতি স্মারকে প্রথম স্বাক্ষর আমার। দেশের ক্রীড়াঙ্গন ও ক্রিকেটে ম্যাডাম খালেদা জিয়া ও পরিবারের সদস্যদের অবদান অনেক। আপসহীন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হারালাম। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।’
বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিককে নাড়া দিয়েছে ২০০৫ সালের জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়, এসিসি ও আইসিসি ট্রফি জিতে পাওয়া সম্মাননার কথা, ‘তখন সত্যি বলতে বাংলাদেশের ক্রিকেট অতটা ভালো ছিল না। রেজাল্ট কম, টাকা কম। কোকো ভাই ক্রিকেটে যুক্ত হওয়ার পর থেকে সুযোগ-সুবিধা বাড়তে থাকে। ২০০৪ সালে আমরা সার্ক ট্রফির ফাইনাল খেলে হেরে গিয়েও সংবর্ধনা পেলাম। ওই টুর্নামেন্টের ফাইনাল শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়ার বাসায় নিমন্ত্রণ করে সংবর্ধনা ও কিছু পুরস্কার দেওয়া হয়ছিল। ২০০৭ সালে আইসিসি ট্রফি জেতার পরও সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তিনি আমাদের একটি প্লট কেনার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন পূর্বাচলে। খেলোয়াড়দের প্রতি কতটা দরদি হলে এত কিছু করতে পারেন তিনি।’
আইসিসি ট্রফিজয়ী দলের সদস্য খালেদ মাসুদ পাইলটের দৃষ্টিতে, ‘আমি তখন জুনিয়র ক্রিকেটার ছিলাম। খুব বেশি কিছু বলার সুযোগ ছিল না। সামনের সারিতে থাকতেন আকরাম খান, বুলবুল ভাইরা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁকে সামনাসামনি দেখা। আমাদের আপ্যায়ন করার পর একটি বড় ডিনার সেট দিয়েছিলেন তিনি। সেই ডিনার সেটটি এখনও আছে।’
জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের দৃষ্টিতে খালেদা জিয়া সবার থেকে আলাদা, ‘২০০৪ সালে ভারতকে হারালাম ঢাকা স্টেডিয়ামে। জেতার পর আমি ও ডেভ হোয়াটমোর রাতে তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। তিনি খুবই খুশি ছিলেন। অনেক রাত হলেও তিনি অপেক্ষা করছিলেন এবং নিজের হাতে মিষ্টি খাওয়ালেন। ২০০৫ সালে টেস্ট ম্যাচ জেতার পরও ফোন করেছিলেন। তিনি অল্প কথা বললেও আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলতেন। ওই সময়ে অনেক কিছু দেখেছি। ওই সময়ে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ দিয়েছিলেন লটারি ছাড়া। তিনি একটি বিষয়ে সবার থেকে আলাদা ছিলেন। কৃতিত্ব নিতেন না। খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব দিতেন।’ স্মৃতির ভান্ডার খুলে দিয়ে সাবেক ক্রিকেটাররা ফিরে গেলেন সেই সোনালি সময়ে।
আরও পড়ুন বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক খালেদা জিয়া
ঢাকাভয়েস/এই

No comments