Adsterra

লোড হচ্ছে...

জুলাইযোদ্ধারা কেন পথ হারাল?


জুলাইযোদ্ধারা কেন পথ হারাল?ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News

মাত্র ১৬ মাস আগে যারা ছিলেন বাংলাদেশের আইকন, যাদের একনজর দেখার জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত, তাদের নিয়ে আজ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন। একসময় যাদের দেখে দেশের নিপীড়িত মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল, ভেবেছিল এদের হাতেই গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ, ৫৪ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে। যারা আশা করেছিল, এক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে এদের নেতৃত্বে-তারা আজ আশাহত। কারণ জুলাই যোদ্ধারা নিজেরাই এখন বিভক্ত, পথহারা।

কেন এমন হলো?

২০২৪ সালে যাদের নেতৃত্বে আমরা পেয়েছিলাম নতুন বাংলাদেশ। অসীম সাহস আর দৃঢ় প্রত্যয়ে যারা লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। যারা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিল, সেই বীর তরুণদের কথা বলছি। তারা কেন আজ বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আটকে গেল?

আমাদের তারুণ্যের দ্রোহ কি আবারও ব্যর্থ হলো? যেমন হয়েছিল ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের পর?

’২৪-এর বীরদের আজকের অবস্থা বুঝতে হলে আমাদের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তরুণদের ইতিহাস জানতে হবে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল তরুণদের বীরগাথা। এ দেশের তরুণরাই ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল। তরুণদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার।

’৫২ থেকে ’৭১- আমাদের মুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি ধাপেই ছাত্র-তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছিল। বিজয়ের পর সবাই আশা করেছিল তরুণরা অস্ত্র জমা দিয়ে দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু সেটা হয়নি। তরুণদের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের পর বিপথগামী হয়ে যায়। নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তারা।

তরুণদের এই বিভ্রান্তি বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছিল। মহান স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারেনি। তরুণদের এক অংশের হঠকারিতা এবং বাড়াবাড়িতে মানুষ হতাশ হয়েছিল তখন।

’২৪-এর গণ অভ্যুথানের পরও ঠিক একই রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। জুলাই বিপ্লবের পর গত বছরের ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্র্বর্তী সরকার। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এ সরকারে তিনজন ছাত্র প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এটাই ছিল জুলাই বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় ভুল। উপদেষ্টা হওয়ার জন্য যে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তা তাদের ছিল না। গত ১৬ মাসে অন্তর্র্বর্তী সরকারের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছাত্র উপদেষ্টাদের কারণে সরকার বিভিন্ন সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে আসিফ মাহমুদ এবং মাহফুজ আলম বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এ দুই উপদেষ্টার কারণে জুলাই যোদ্ধাদের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, কী পরিবর্তন হলো? ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন মানুষ কেবল হতাশ হয়নি, ক্ষুব্ধও হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে সবাই একই রকম হয়ে যায়। ছাত্র উপদেষ্টারা নিজেদের দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত রাখতে পারেননি। শুধু ছাত্র উপদেষ্টা কেন? জুলাই আন্দোলনের অনেক সম্মুখসারির নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধে বদলি, তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। জেলা প্রশাসক পদায়নে দুর্নীতি, পাঠ্যপুস্তক ছাপায় দুর্নীতিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের বিরুদ্ধে। এসব কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যা তা পরের বিষয়, সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দুর্নীতিমুক্ত রাখতে পারেনি। এ সময় দেশজুড়ে চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য এবং মব সন্ত্রাসে জড়িয়ে যায় আন্দোলনে জড়িতদের নাম। সারা দেশে সংগঠিত এসব ঘটনা জুলাই বিপ্লবের নায়কদের ইমেজ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জুলাই আন্দোলনের সূর্যসন্তানদের নিয়ে যখন নানা ধরনের প্রশ্ন এবং সমালোচনা ঠিক তখনই তারা নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেয়। সাধারণ মানুষ এ রাজনৈতিক উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেনি। জনগণের মধ্যে এরকম ধারণা তৈরি হয় যে, এই তরুণরা প্রচলিত রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারেনি। রাজনীতি-ক্ষমতা- দুর্নীতি- এই পুরোনো বৃত্তেই তারা বন্দি হয়ে পড়েছে। এ সময় জুলাই আন্দোলনের সম্মুখযোদ্ধাদের বেশভূষা, জীবন-যাপনে অলৌকিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পুরোনো ও নতুন ছবি নিয়ে শোরগোল পড়ে। হঠাৎ করেই তাদের বিলাসী জীবনের অর্থের উৎস নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এসব কিছুর কারণে দ্রুত কমতে থাকে তাদের জনপ্রিয়তা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের রাজনৈতিক দল এনসিপির ওপর। উমামা ফাতেমার মতো অনেকেই এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হননি। ফলে রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের মূল শক্তি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বিভক্ত হয়ে যায়।

এনসিপি গঠিত হওয়ার পর থেকেই অন্তর্র্বর্তী সরকারের আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করে। নিবন্ধিত হওয়ার আগেই সরকার দলটিকে প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। প্রধান উপদেষ্টা যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে তিনটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলার সংস্কৃতি তৈরি করেন। বিএনপি এবং জামায়াত নিঃসন্দেহে এখন প্রধান দুই দল। কিন্তু এই দুই দলের সঙ্গে এনসিপিকে ডাকা শুরু হলে তাদের অনেকেই কিংস পার্টি হিসেবে ভাবতে শুরু করে। এ ভাবনা চূড়ান্ত রূপ পায়, যখন এনসিপির প্রতীক নিয়ে সরকার আইন পরিবর্তন করে। নিবন্ধনের জন্য দলটি শাপলা প্রতীক দাবি করে। কিন্তু শাপলা তালিকায় না থাকায় নির্বাচন কমিশন তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর এনসিপি রীতিমতো জেদ ধরে। অবশেষে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে প্রতীক তালিকায় শাপলা কলি যুক্ত করা হয়।

এনসিপি গঠিত হওয়ার পর তাদের দল চালানোর জন্য অর্থের উৎস নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে তাদের আদর্শ নিয়েও। তাদের রাজনীতির নতুনত্ব কী? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। নির্বাচনে দলটির এদিক-ওদিক ছোটাছুটি তাদের আদর্শহীনতাকেই প্রকট করে তুলেছে। প্রথমে তারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। এর প্রধান কারণ বিএনপির অনীহা। বিএনপি এনসিপির ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি একাধিক কারণে। প্রথমত, বিএনপির মতো একটি বড় দলে নিজেদের প্রার্থীর অভাব নেই। দলটির অনেক যোগ্য প্রার্থী মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতার কারণে। দ্বিতীয়ত, বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় থাকা দল, ভোটের রাজনীতি দলটি খুব ভালো বোঝে। ভোটের মাঠে যে এনসিপির মূল্য কম এটা বুঝেই তারা এনসিপিকে এড়িয়ে গেছে। এনসিপি নিজেরাও বুঝতে পারে তাদের জনপ্রিয়তা আর ’২৪ সালের আগস্টের মতো নেই। দলটির রাজনৈতিক পরিপক্বতার অভাবের কারণে দেখা যায় মতবিরোধ। এই মতবিরোধ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠন নিয়ে।

আসন সমঝোতা ও জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে এনসিপিতে। জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নেতা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলছেন, ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্ত হবে দেশের জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি। এতে আপত্তি জানিয়ে নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন এনসিপির ৩০ নেতা। তার ওপর জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চাচ্ছেন না এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, নুসরাত তাবাসসুম ও তাজনুভা জাবিন, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা ও নাহিদা সারোয়ার নিভা।

যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুল হক ও যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ।

জোট প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পর এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। এমন ঘোষণা দিয়ে শনিবার রাতে তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতায় গেলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।

গতকাল সকালে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

কার্যত এনসিপির ভাঙনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারুণ্যের আরেকটি সম্ভাবনার মৃত্যু হলো। তরুণরা সম্ভাবনা জাগিয়েও নিজেদের আলাদা প্রমাণ করতে পারল না। তারা পথ হারাল।  রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সবচেয়ে ভালো হতো জুলাই আন্দোলনের পর যদি এই তরুণরা ক্লাসরুমে ফিরে যেত। জাতির বিবেক হয়ে থাকত। যখনই রাজনৈতিক দলগুলো ভুল করত তখন তাদের ভুল ধরিয়ে দিত। শিক্ষাজীবন শেষ করে ধীরে ধীরে তারা রাজনীতিতে জড়িত হতো। কিন্তু শুরুতেই তাদের রাজনীতির শর্টকাট পথ দেখানো হয়েছে। উপদেষ্টা বানিয়ে, টাকা বানানোর সহজ উপায় দেখিয়ে দিয়ে, রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্বুদ্ধ করে তাদের বিপথে নিয়ে গেছে একটি গোষ্ঠী। আর সেকারণেই পথ হারিয়েছে জুলাই আন্দোলনের সূর্যসন্তানরা।

আরও পড়ুন  বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক খালেদা জিয়া    

ঢাকাভয়েস/এই

No comments

Powered by Blogger.