Adsterra

লোড হচ্ছে...

তোমার কাছে আমার আরও বেশি যাওয়া উচিত ছিল...


তোমার কাছে আমার আরও বেশি যাওয়া উচিত ছিল,ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News

হুমায়ূন আহমেদ— বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তাঁর আলো ছড়িয়ে আছে উপন্যাসে, নাটকে, সিনেমায়, এমনকি মানুষের হৃদয়ে। আজ এই কিংবদন্তির ৭৮তম জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে শোবিজের মানুষেরা নিজেদের মতো করে উদযাপন করেন। বিশেষ এই দিনে হুমায়ূনপুত্র নুহাশ বাবাকে নিয়ে বলেছেন তাঁর অস্তিত্বজুড়ে বাবা আছেন। কর্মক্ষেত্রে নিজ যোগ্যতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা নুহাশ বাবাকে নিয়ে কথা বলতে গেলে এখনও শ্রদ্ধায়, ভালোবাসা আর স্মৃতিকাতর হয়ে যান। বাবাকে শুধু আমি না, বাংলাদেশের কোনো মানুষই তাঁকে ছাড়তে পারবে না—এমন কথা বলার সময় নুহাশ হুমায়ূনের কণ্ঠে ছিল মায়ার ছোঁয়া, আবার একরাশ দৃঢ়তাও। হুমায়ূন আহমেদের ছেলে হয়েও তিনি বরাবরই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন নিজের পথ, নিজের আলোয়। কিন্তু কথা যখন আসে বাবা হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে, তখন তাঁর ভেতরটা কাঁপে, গলার স্বর নরম হয়ে আসে। ‘উনি দেশের মানুষের কাছে যে পজিশনে আছেন, সেখানে আর কেউ পৌঁছাবে না। হুমায়ূন আহমেদ একজনই ছিলেন, একজনই আছেন, আর দ্বিতীয়জন আসবে না,–বাবাকে নিয়ে এভাবেই বলছিলেন নুহাশ হুমায়ূন। দেশের অন্যতম প্রশংসনীয় নির্মাতা এখন নুহাশ। কখনও কি কেউ প্রশংসা করে বলেন, নির্মাতা তুমি বাবাকেও ছাড়িয়ে যাবে? এমন কথার বিপরীতে কিইবা অনুভূতি হয় হুমায়ূনপুত্রের। নুহাশ বললেন, বাবাকে ছাড়িয়ে যাবে—জানি না কেউ এমনটি বলে কিনা। আমার কাছে মনে হয়, শুধু আমি না, বাংলাদেশের কেউই তাঁকে ছাড়াতে পারবে না। আমরা সবাই তাঁকে ট্রিবিউট দিতে পারি, নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারি, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ সবসময় হুমায়ূন আহমেদই থাকবেন। বাবার প্রতি এই অনুভূতিটা শুধু কথায় নয়, নুহাশের কাজে, শিল্পে, এমনকি নীরবতায়ও ফুটে ওঠে বারবার। 

একটি না-পড়া চিঠি

২০১২ সালের জুলাই। হুমায়ূন আহমেদ তখন জীবনের শেষ অধ্যায়ে। সেই সময় নিউইয়র্কে শয্যাশায়ী বাবার উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছিলেন ছেলে নুহাশ। চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল চাচা-চাচিদের হাতে, কিন্তু পাঠকের শোনার সুযোগ হয়নি—কারণ হুমায়ূন আহমেদ আর কোনোদিন পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে পাননি। চিঠিটা পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয় নানা গণমাধ্যমে। কী লেখা ছিল সেই চিঠিতে? ‘বাবাকে লেখা চিঠি’ শিরোনামের ওই চিঠিতে নুহাশ লিখেছিলেন–‘‘আমার মনে হয় না আমি তোমার পাশে ছিলাম, অন্তত ততটা যতটা থাকা উচিত ছিল। যখন তোমাকে ফোন করতাম, প্রায়ই তুমি কথা বলার মতো অবস্থায় থাকতে না–তোমার বাসায় যেতে গিয়ে গেটে বাধা পাওয়া কষ্টকর ছিল। বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে কোনো ছেলেরই প্রত্যেকবার নিরাপত্তাপ্রহরীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কথা নয়... তোমার কাছে আমার আরও বেশি যাওয়া উচিত ছিল। আমি চাই, সবকিছু বদলে যাক। আমি তোমাকে জানাতে চাই, আমি তোমাকে অসম্ভব মিস করি। তুমি জেনো, আমি যতটা তোমাকে আমার পাশে পেতে চাই, ততটা পাই না বলে আমার ভেতরটা এখনো পোড়ায়।’’চিঠিতে তিনি আরও লেখেন, ‘‘আমার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, আমি তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাব, তুমিও আর আমাকে তোমার ছেলের মতো করে দেখবে না। বিবাহবিচ্ছেদের কয়েক দিন পরে তুমি আমাকে ফোন করলে। বললে, বিশাল সব গলদা চিংড়ি নিয়ে এইমাত্র তুমি বাজার থেকে এসেছ। বললে, তুমি ওগুলো রান্না করতে চাও, তোমার বাসায় আমার সঙ্গে বসে খেতে চাও। তুমি-আমি দুজনেই জানতাম, এটা সম্ভব হবে না। ঠান্ডাযুদ্ধের সময় ঘটা করে ভোজ করা যায় না। কিন্তু ব্যাপারটা ওখানেই শেষ হলো না। প্রায় আধঘণ্টা পরে ইন্টারকম বাজতে শুরু করল। গার্ড আমাকে জানাল, গেটের বাইরে আমার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটা জ্যান্ত গলদা চিংড়ি। প্রথমে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। তারপর মজা লাগল। খানিক উত্তেজনা নিয়ে নিচে নেমে গেলাম। তুমি বললে, ‘বাবা, আমি খুব চাচ্ছিলাম এটা আমরা একসঙ্গে খাই। কিন্তু সেটা তো এখন সম্ভব না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, সব সময় আমি তোমার পাশে থাকব। একদিন আমরা আবার একসঙ্গে বসে ভালো খাবার খাব। কিন্তু আপাতত আমি চাই তুমি এটা খাও।’’ তারপর তুমি আমার হাতে তুলে দিলে একটা জ্যান্ত গলদা চিংড়ি। পানির ফোঁটার মতো চোখ আর সরু সরু ঠ্যাংওয়ালা ওই সাংঘাতিক জীবটাকে আমার মনে হচ্ছিল আশা।’’চিঠির শেষে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘এই চিঠি তোমার জন্য আমার গলদা চিংড়ি।’’ গলদা চিংড়ির এই উল্লেখটা হুমায়ূন আহমেদ-নুহাশ সম্পর্কের এক নিঃশব্দ প্রতীক হয়ে ফুটে ওঠে। দূরত্বের মাঝেও মায়ার অটুট সেতুবন্ধনের কথাই প্রমাণ করে।

অস্তিত্ব জুড়ে বাবা

নুহাশ বলেন, ‘পিতার প্রতি ভালোবাসা নতুন করে প্রকাশ করার কিছু নেই। বাবা আমার অস্তিত্ব জুড়ে।’ বাবার উত্তরাধিকার তার কাজে নানা রূপে ধরা দেয়। তবে তিনি কখনোই হুমায়ূনের ছায়ায় আটকে থাকতে চাননি। বরং হুমায়ূনসন্তান নুহাশ হয়ে নয়, নিজস্ব নুহাশ হয়ে উঠতে চান। তাই নিজের আলাদা জগৎ ও গতিপথ তৈরি করেছেন।

হুমায়ূনের চরিত্রকে চলচ্চিত্রে রূপ 

গল্প-উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্র সৃষ্টি করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর মধ্যে মিসির আলী ও হিমু অনবদ্য। বাবার চরিত্রগুলো নিয়ে কিছু করার পরিকল্পনা আছে কিনা তার বিষদ ব্যাখ্যা করেছেন নুহাশ। কেউ হুমায়ূনের চরিত্রগুলো নিয়ে কাজ করলে তাতে স্বাগতমও জানাবেন বলে জানিয়েছেন। নুহাশ বলেন, ‘আমি এটি করার বিরোধী নই, কারণ সেই গল্পগুলোর একজন অধিকারী আমি নিজেও। তবে আমি চাই, বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতারা আমার কাছে এসে বাবার চরিত্রগুলো রূপান্তরের অনুমতি চাক। আমি চাই, নতুন শিল্পীরা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিতে হুমায়ূন আহমেদের কাজকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করুক। 

নুহাশের জগৎ

বর্তমান সময়ে নুহাশ হুমায়ূন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক (ইন্টারন্যাশনাল) প্ল্যাটফর্মে এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর হরর (হরর) অ্যান্থলজি (অ্যান্থলজি) ‘পেট কাটা ষ’ বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে, বিশেষ করে জর্ডান পিলি এর মনকিপ প্রোডাকশনের সঙ্গে যৌথ কাজ তাঁকে দিয়েছে একজন গ্লোবাল গল্পকারের। সাম্প্রতিক সময়ে শাডারের জন্য তাঁর পরিচালিত ফরেনার্স অনলি সিরিজে বাংলাদেশি সংস্কৃতি, ভয়, একাকিত্ব এবং মানবিকতার অনন্য মিশ্রণ দেখা গেছে। এই কাজটির জন্য নুহাশ যুক্ত হয়েছেন রাইটার্স গিল্ড অব আমেরিকার সদস্য হিসেবেও; যা কোনো বাংলাদেশি পরিচালকের জন্য প্রথমসারির অর্জন। তাঁর নির্মিত ‘মশারি’ স্বল্পদৈর্ঘ্যটিও আলোচিত হয় বিশ্বমঞ্চে। এছাড়া তাঁর নতুন সিরিজ মশারি এক্সটেন্ডেড ইউনিভার্স; যেখানে আগের শর্ট ফিল্মের ধারাবাহিকতায় দেখা যাবে এক ভয়ংকর কিন্তু মানবিক পোস্ট–অ্যাপোক্যালিপটিক দুনিয়া। নুহাশের ভাষ্য, ‘পেটকাটা ষ’ আর ‘মশারি’ মুক্তির পর আমার জীবন বদলে গেছে। ‘মশারি’ আমাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে পরিচিতি দিয়েছে, তা আমার জন্য একেবারেই নতুন এক দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এরপর আমি সিএএ আর অ্যাননিমাস কনটেন্ট-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হই। এ বছর রাইটার্স গিল্ড অব আমেরিকার সদস্য হই–সেখান থেকেই আমার যাত্রা নতুন মাত্রা পায়। 

 আরও পড়ুন   নতুন কিছু করতে ভয় পান? আপনারও থাকতে পারে ‘নিওফোবিয়া’

ঢাকাভয়েস/এই

No comments

Powered by Blogger.