‘ভেবেছিলাম, বাঁচার আর আশা নেই’
ওই দিন স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৬ মিনিটে হামলা হয় আমাদের জাহাজে। নৌযানের মতো দেখতে তিনটি ড্রোনের একটি প্রথমে আঘাত হানে জাহাজের প্রপেলারে। ১০ মিনিট পর আরেকটি ড্রোন আঘাত করে তেলের ট্যাঙ্কারে। আগুন জ্বলতে থাকে জাহাজের চারপাশে। ভেবেছিলাম, বাঁচার আর আশা নেই। প্রায় এক ঘণ্টা পর তুরস্কের কোস্টগার্ড এসে আমাদের উদ্ধার করে। শহরের একটি হোটেলে এখন নিরাপদে আছি আমরা চার বাংলাদেশি।’
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ক্যাপ্টেন সাখাওয়াত হোসেনকে হোয়াটসঅ্যাপে হামলা ও বেঁচে ফেরার মুহূর্তকে এভাবেই তুলে ধরেন জাহাজটির চতুর্থ প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলাম প্লাবন। ঘটনার বিস্তারিত জানতে হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন সমকালের এই প্রতিবেদকও।
প্লাবনের বাড়ি বাংলাদেশের নরসিংদীতে। একই জাহাজে ছিলেন দেশের আরও তিন নাবিক। তারা হলেন– চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজগর হোসাইন, কুষ্টিয়ার আল আমিন ও ঢাকার ধামরাইয়ের হাবিবুর রহমান। আল আমিন ক্যাডেট, বাকি দুজন নাবিক। সবাই এখন নিরাপদে আছেন। তবে চাইলেও এই মুহূর্তে দেশে ফিরতে পারবেন না তারা। এ জন্য অন্তত ১০ থেকে ১৪ দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।
‘এমটি কায়রোস’ নামে জাহাজটি চীনা কোম্পানির; ক্যাপ্টেনও চীনের। ওই জাহাজে চার বাংলাদেশিসহ ২৫ নাবিক ছিলেন। এমটি কায়রোস ছাড়াও সেদিন আরও একটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা করে ইউক্রেনের নৌবাহিনী। এই দুটি জাহাজ রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহরের’ অংশ হিসেবে কৃষ্ণসাগর অতিক্রম করছিল।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশি নাবিক মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার ঘটনা এটা দ্বিতীয়। এর আগে ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রাশিয়ার মিসাইল আঘাত করে বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’কে। সেই সময় নিহত হন জাহাজটির প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান।
কোথায় আছেন, কেমন আছেন তারা
হামলার পর থেকে নাবিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্লাবনের সঙ্গে শনিবার কথা বলেছি আমি। ওদের কারও পরিবারের নাম-ঠিকানা আমরা এখনও পাইনি। তবে তারা নিরাপদে তুরস্কের হোটেলে আছে। আমাদের হয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে তুরস্কের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ওয়ার্কার্স ফেডারেশন। জাহাজ মালিক ও তুরস্ক কর্তৃপক্ষ সব রকমের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। চার বাংলাদেশি পাসপোর্ট জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে জমা দিয়েছিলেন বলে জেনেছি।’
কবে ফিরবেন চার বাংলাদেশি
নৌ বাণিজ্য দপ্তরের সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার সাব্বির মাহমুদ বলেন, ‘সব ডকুমেন্ট অক্ষত থাকলেও এই ধরনের ঘটনায় আক্রান্তদের দেশে ফিরতে ১০ থেকে ১৪ দিন সময় লাগতে পারে। আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করবে তাদের দ্রুত দেশে ফেরার বিষয়টি। জাহাজে ওঠার সময় নাবিকদের পাসপোর্ট, সিডিসি, সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা রাখতে হয় ক্যাপ্টেনের কাছে। জাহাজে যেহেতু আগুন লেগেছে, ডকুমেন্টগুলো কতটা সুরক্ষিত আছে, তা এখন দেখার বিষয়। সব ঠিক থাকলে ইমিগ্রেশন পার হওয়া সহজ হবে। অন্যথায় বিশেষ ব্যবস্থায় সময় বেশি লাগবে।’
কত ক্ষতিপূরণ পাবেন
এমটি কায়রোসে ২৫ নাবিক থাকলেও বাংলাদেশি ছিলেন চারজন। যে জাহাজটিতে তারা ছিলেন, আগুনে পুড়ে সেটি ব্যবহারের উপযোগিতা হারিয়েছে। পরিত্যক্ত এ ধরনের জাহাজে যারা চাকরি করেন, তারা তিন মাসের বেতন পান ক্ষতিপূরণ হিসেবে। দেশে ফেরার পর তাদের নতুন করে চাকরি খুঁজতে হবে। তবে এ ধরনের ঘটনায় কেউ মারা গেলে ক্ষতিপূরণ গুনতে হয় জাহাজ মালিককে।
দুই জাহাজে হয়েছে ড্রোন হামলা
তুরস্কের উপকূলে শুক্রবার হামলা হয় ‘এমটি কায়রোস’ ও ‘বিরাট’ নামের দুটি জাহাজে। ইউক্রেনের সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে ‘সি বেবি’ নামের বিশেষ নৌ ড্রোন, যা তৈরি করেছে দেশটির নিরাপত্তা পরিষেবা। রাশিয়ার জ্বালানি খাত থেকে যুদ্ধ-অর্থায়নের মূল উৎস দুর্বল করতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ ধরনের হামলা বাড়িয়েছে কিয়েভ।
আরও পড়ুন শেখ হাসিনার ৫, রেহানার ৭ ও টিউলিপের ২ বছরের কারাদণ্ড
ঢাকাভয়েস/এই
.jpg)

No comments