১৮৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ: সাফল্যের আড়ালে সমস্যা
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলো
১৮৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা কলেজ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ প্রশাসনের হাত ধরে এই কলেজে আধুনিক শিক্ষার সূচনা হয়। একসময় কেবল উচ্চমাধ্যমিক নয়, বরং দর্শন, ইতিহাস, গণিত ও ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর শিক্ষার জন্যও এটি ছিল কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিবেশী দেশ থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসতেন। তাঁদের জন্য ছিল বিশেষ ‘আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস’।ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা একসময় দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দিতেন। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে ভাষা আন্দোলন—প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্বে এই কলেজের ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। কলেজটির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আছেন অসংখ্য বিশিষ্ট শিক্ষক, রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানী।
অতীতের পড়াশোনা বনাম বর্তমান বাস্তবতা
একসময় এই কলেজে ক্লাসে উপস্থিতি ছিল শতভাগ, শিক্ষকরা পাঠদান ছাড়াও গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ব্যস্ত থাকতেন। লাইব্রেরিতে ছিল নিরবচ্ছিন্ন পাঠচর্চার পরিবেশ। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এখনো কলেজটি ভালো ফলাফল ধরে রেখেছে, কিন্তু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মান অনেকটা কমেছে। শিক্ষকদের সংখ্যা কম, অবকাঠামো পুরোনো, গবেষণার পরিবেশ প্রায় অনুপস্থিত।শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—বেশিরভাগ সময় শিক্ষকসংকটের কারণে নির্ধারিত ক্লাস হয় না। আবার যেসব ক্লাস হয়, সেগুলোও বড় আকারের ব্যাচে হওয়ায় পাঠদানের মান নষ্ট হয়।
রাজনীতির গ্যাড়াকলে ঢাকা কলেজ
রাজনীতি একসময় ছিল শিক্ষার্থীদের সামাজিক নেতৃত্ব গঠনের অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি দখল, আধিপত্য ও সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। ছাত্ররাজনীতি এখন অনেকাংশে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে। সেশনজট, ভর্তিতে অনিয়ম, সিট বরাদ্দে প্রভাব—সবকিছুতেই রাজনীতির ছায়া রয়েছে।শিক্ষার্থীদের ভাষায়, “যেখানে পড়াশোনার পরিবেশ থাকা উচিত, সেখানে রাজনীতির ভয় কাজ করে। নতুনরা পড়ার চেয়ে নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তা করে।” তবে কলেজ প্রশাসনের দাবি, এখন রাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। ছাত্রাবাসে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয় মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে।
অবকাঠামো ও আবাসনের করুণ চিত্র
ঢাকা কলেজের সবচেয়ে বড় সংকট অবকাঠামো ও আবাসনে। বর্তমানে আটটি ছাত্রাবাস থাকলেও বেশিরভাগই পুরোনো ও জরাজীর্ণ। মোট আসনসংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০, অথচ শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি। আখতারুজ্জামান ছাত্রাবাসে এক কক্ষে আটজন শিক্ষার্থী থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। দক্ষিণ ছাত্রাবাসে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে নিয়মিত। বিজয় ২৪ ছাত্রাবাসে (আগের নাম শেখ কামাল) একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একেক কক্ষে আটজন করে থাকেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, “একেকটা বিছানায় দুজন করে থাকতে হয়। কখনো পানির সংকট, কখনো বিদ্যুৎ সমস্যা। রাতের বেলা পড়াশোনা করাই কঠিন।”
শিক্ষক ও কর্মচারীর ঘাটতি
ঢাকা কলেজে শিক্ষক পদের সংখ্যা ২০১ হলেও ১৫টি পদ শূন্য। সংযুক্ত শিক্ষকসহ মোট শিক্ষকসংখ্যা ২০৭। অনেক বিভাগে একজন শিক্ষককে একাধিক স্তরে (এইচএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত) ক্লাস নিতে হয়। এক শিক্ষক বলেন, “সব শিক্ষার্থী একসঙ্গে ক্লাসে এলে জায়গাই হতো না। ছাত্রসংখ্যা কমানো দরকার।” সহায়ক কর্মচারীর সংকটও ভয়াবহ। সরকারি কর্মচারী মাত্র একজন, বাকি তিনজন মাস্টাররোলে কাজ করেন—তাঁদের বেতন শিক্ষার্থীদের ফি থেকে দেওয়া হয়।
প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ ও বিতর্ক
সরকার সম্প্রতি ঢাকা কলেজসহ রাজধানীর সাত সরকারি কলেজকে একীভূত করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ বলছেন, এতে শিক্ষার মান বাড়বে; কেউ আশঙ্কা করছেন, এতে ঢাকা কলেজের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। একজন সাবেক অধ্যাপক বলেন, “ঢাকা কলেজের পরিচিতি তার ঐতিহ্য ও স্বাধীন শিক্ষাগত কাঠামোতে। সেটি যদি হারায়, তাহলে কলেজটি তার আত্মা হারাবে।”
গবেষণার ঘাটতি ও আধুনিকায়নের দাবি
ঢাকা কলেজে গবেষণার পরিবেশ কার্যত অনুপস্থিত। আধুনিক ল্যাব, রিসার্চ গ্রান্ট কিংবা ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্নাতকোত্তরে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, “ঢাকা কলেজে গবেষণা তহবিল গঠন, আধুনিক ল্যাব ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি। এতে শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম ইলিয়াস বলেন, “আমরা চাই শিক্ষার মান ও অবকাঠামো আরও উন্নত হোক। শ্রেণিকক্ষ ও আবাসন সংকট দূর করতে বহুতল ভবনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হচ্ছে।” শিক্ষার্থীদের আশা, কলেজের ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে। তারা চান, রাজনীতি নয়—শিক্ষা হোক প্রধান পরিচয়।ঢাকা কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসের অংশ। সময়ের চাপে ঐতিহ্য কিছুটা ম্লান হলেও এর সম্ভাবনা এখনো অটুট। প্রয়োজন সঠিক নীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ। তাহলেই হয়তো আবারও জেগে উঠবে ১৮৪ বছরের গৌরবময় সেই ঢাকা কলেজ—যে কলেজ একদিন ছিল জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক।
আরও পড়ুন ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানোর নতুন অস্ত্র এআই: গবেষণা
%20(1).webp)

No comments